সম্রাট আকবরকে ‘দুশ্চরিত্র’ বললেন বিজেপি নেতা-মদনলাল

78

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:ভারতীয় উপমহাদেশের মুঘল সামাজ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট আকবরকে ‘দুশ্চরিত্র’ বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন বিজেপি’র এক নেতা।

বৃহস্পতিবার জয়পুরে মেবারের রাজা মহারাণা প্রতাপ সিংহের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে রাজস্থান বিজেপির সভাপতি মদনলাল সাইনি মুঘল সম্রাট আকবর সম্পর্কে এ বিতর্কিত মন্তব্য করেন।

তার দাবি, হুমায়ুনের পূত্র তৃতীয় মুঘল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবর একজন চরিত্রহীন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘নারীসঙ্গ উপভোগ’ করার জন্যই মীনা বাজার চালু করেছিলেন এবং সেখানে তিনি প্রায়ই ঢুঁ দিতেন।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, সাইনির এই মন্তব্যে যথারীতি প্রতিবাদ এসেছে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। ভারতের প্রাচীন এই দলটি বলছে, আকবর সম্পর্কে সাইনির মন্তব্য ‘ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা’ মাত্র।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে মুঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট আকবর নানা কারণেই আলোচিত। ১৫৪২ সালের ১৫ অক্টোবর অমরকোটে জন্ম নেয়া আকবর বাবা দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পর যখন সিংহাসনে আরোহণ (১৫৫৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি) করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর।

বিভিন্ন ইতিহাসবিদের তথ্য মতে, বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত আকবরকে নিজের সিংহাসন রক্ষা করা ছাড়াও বিভিন্ন রাজ্যের বিদ্রোহ দমন, রাজ্য বিস্তার, শত্রুর আক্রমণ মোকাবেলাতেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। সে সময় রাজপুতদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার স্বার্থে আকবর বিভিন্ন রাজবংশের রাজকন্যাদের বিয়েও করেন। সমাজ সংস্কারমূলক বিভিন্ন অবদানের জন্য ইতিহাসে তাকে ‘মহান আকবর’ বা ‘আকবর দ্য গ্রেট’ও বলা হয়ে থাকে।

এই জায়গাটিতেই আপত্তি বিজেপি নেতা মদনলাল সাইনির। তিনি বলেন, “মুঘল সম্রাট আকবর মোটেই মহান ছিলেন না। নারীসঙ্গ উপভোগ করতে তিনি প্রায়ই মীনা বাজারে ঢুঁ মারতেন ছদ্মবেশে। সেখানে গিয়ে মহিলাদের সঙ্গে দুর্বব্যবহার, দুষ্কর্ম করতেন। এসব ঘটনা ইতিহাসে লেখা রয়েছে, সারা বিশ্বই জানে।
সম্রাট আকবরই চালু করেছিলেন মীনা বাজার, যেখানে পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। মীনা বাজার ছিল শুধুই নারীদের কর্মক্ষেত্র।

রাজস্থান বিজেপির সভাপতি বলেন, “আকবর মীনা বাজারে গিয়ে বিকানেরের রাজপুত রানি কিরণ দেবির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করায় রানি এতটাই রেগে গিয়েছিলেন যে, তিনি আকবরকে মাটিতে ঠেলে ফেলে দিয়ে বুকে তলোয়ার ঠেকিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত রানির কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল সম্রাটকে। ওই ঘটনার পর মীনা বাজারও বন্ধ হয়েছিল।”

কোন ইতিহাস বই থেকে মুঘল সম্রাটদের সম্পর্কে এই ধরণের তথ্য পেয়েছেন মদন লাল সাইনি? এই নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু হয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করছে একাধিক দল। রাজস্থানের মদনের মুখে এ ধরনের বক্তব্য নতুন কিছু নয়। গেল বছরের জুলাইয়েও মুঘল আমল নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

রাজস্থানে বিজেপি ক্ষমতায় থাকার সময় স্কুলের পাঠ্যবই থেকে সম্রাট আকবরের নামের আগে ‘মহান’ বিশেষণটি বাদ দেয়া হয়। স্কুলের ইতিহাস বইয়ে তখন এও লেখা হয়, হলদিঘাটের যুদ্ধে আকবর পরাজিত হয়েছিল মেবারের মহারাণা প্রতাপের কাছে, পরে অবশ্য সংশোধন করা হয়। ইতিহাস বলছে, কয়েকটি কারণে আকবরের মেবার আক্রমণ অবশ্যাম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। মেবারের রাজা রাণা উদয় সিংহ আকবরকে ঘৃণার চোখে দেখতেন এবং তিনি মালবের রাজা বাজবাহাদুরকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাছাড়া গুজরাট আক্রমণ করতে চিতোর দখল করা জরুরি ছিল।

১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে আকবর মেবারের রাজধানী চিতোর আক্রমণ করলে শুরুতেই উদয় সিংহ পালিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নেন। কিন্তু জয়মল এবং পত্ত নামক দুইজন প্রায় চার মাস ধরে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধে দুই সেনাপতি নিহত হলে, দুর্গের ভিতরের নারীরা আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে চিতোর আকবরের দখলে আসে। আসফ খাঁকে মেবারের শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়।

১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে উদয় সিংহের মৃত্যুর পর তার ছেলে রাণা প্রতাপ সিংহ ফের মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। খবর পেয়ে আকবর সেনাপতি মানসিংহ এবং আসফ খাঁর অধীনে বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে হলদিঘাটের যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুঘল বাহিনীর সামনে টিকতে না পেরে বাবার মতোই পার্বত্য অঞ্চলে পালিয়ে যান প্রতাপ সিংহ।

তবে বিজেপি নেতা সাইনির মতে, মহারাণা প্রতাপের সঙ্গে আকবরের কোনো তুলনাই হয় না। তিনি বলেন, “আমি মনে করি, বই থেকে ওর নাম মুছে দিয়ে মহারাণা প্রতাপের সম্মান, কৃতিত্বকে খাটো করা যাবে না। মহারাণা প্রতাপ রয়েছেন মানুষের হৃদয়ে। সেখান থেকে তাকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তাকে ইতিহাস থেকেও মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ওরা (কংগ্রেস) হয়তো বই থেকে চারটি লাইন মুছে দিতে পারে। কিন্তু ওকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।”

এদিকে সাইনির বক্তব্যের নিন্দা করে কংগ্রেস সভাপতি অর্চনা শর্মা বলেছেন, “মহারাণা প্রতাপের বীরত্ব, তার গুণের কথা গোটা দেশ জানে। দেশ গর্ব বোধ করে। কিন্তু বিজেপি নেতা ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। এতে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা দেখা দেবে। সামাজিক ঐক্য নষ্ট হবে। তাই তা নিন্দনীয়।”

কেন্দ্রে ও বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার আগেও বেশ কয়েকবার অনেক রাস্তা মুঘল আমলের নাম বদলে ফেলেছে। গেল বছর বিজেপি সাংসদ মহেশ গিরি মুঘল সম্রাট আউরঙ্গজেবকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়েছিলেন। যা নিয়ে বিতর্কের থেকে বেশি কৌতুক হয়েছিল।