মানুষ তার বরাদ্দকৃত জীবিকা উপার্জন করে মৃত্যু হবে

0

জাহাঙ্গীর আলম : কোনো মানুষ তার জন্য বরাদ্দকৃত জীবিকা পুরোপুরিভাবে উপার্জন না করে মারা যাবে না। কথাটা শুনে হয়তবা কেমন লাগতে পারে! কিন্তুু এই কথা কোন সাধারণ মানুষের কথা নয়। এটা রাসুল সঃ এর কথা যা চিরন্তন সত্য। আর তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে মানুষ এত চিন্তা গ্রস্ত ও হতাশ হয় কেন? এর মূল কারণ হলো জ্ঞান না থাকা অথবা বিশ্বাসের ঘাটতি হওয়া। আর একটা কথা হলো সম্পদের পরিমান যেহেতু আল্লাহ পক্ষ থেকে নির্ধারিত, তাহলে মানুষ কেন অন্যায় অপকর্মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে? এর উত্তর হল প্রথমত জ্ঞান না থাকা, দিতীয়তো লোভ। তবে সে হালাল পথে উপার্জন করলেও একই সম্পদের মালিক হবে, যদিও কিছুটা বিলম্বিত হয়। আল্লহ রিজিকের মালিক, তিনি যাকে ইচ্ছা অঢেল সম্পদ দান করেন আর যাকে ইচ্ছা সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা কুফরির পথ অবলম্বন করে, তাদের কাছে দুনিয়ার জীবনকে সুন্দর-মুগ্ধকর বানিয়ে দেয়া হয়। তারা মুমিনদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ -তিরস্কার করে থাকে, কিন্তু যারা তাকওয়া অবলম্বন করে কিয়ামতের দিন তারাই এদের মোকাবিলায় উঁচু ও শ্রেষ্ঠ মর্যাদা লাভ করবে। আল্লাহ যাকে চান অগণিত রিজিক দান করেন।’ -বাকারা : ২১২।

মহান আল্লাহ বলেন, আমি রাতকে দিবসে রূপান্তরিত এবং দিবসকে রাত্রিতে পরিণত করি : আমিই জীবন্তকে বের করে আনি মৃত থেকে এবং মৃতকে বের করে আনি জীবন্তের থেকে। আর যাকে ইচ্ছা রিজিক দেয় বেহিসাবে।’ -আলে ইমরান : ২৭।
‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের যে হালাল উত্তম জীবিকা দিয়েছেন, সেগুলো থেকে খাও এবং মহান আল্লাহকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা ঈমান এনেছ।’ -সূরা মায়েদা : ৮৮।
‘পৃথিবীতে বিচরণকারী সব জীবনের রিজিকের দায়িত্ব মহান আল্লাহর। তাদের স্থায়ী-অস্থায়ী অবস্থানস্থল সম্পর্কে তিনি অবহিত। সবই একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।’ -হুদ : ৬।

‘আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং যাকে ইচ্ছা তা সঙ্কুচিত করে দেন। তারা দুনিয়ার জীবন নিয়েই উল্লসিত। অথচ দুনিয়ার জীবন আখিরাতের তুলনায় একটি ক্ষণস্থায়ী ভোগের সময় মাত্র।’ -রাদ : ২৬।

‘যারা আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, তারপর নিহত হয়েছে অথবা তাদের মৃত্যু হয়েছে, অবশ্যই আল্লাহ তাদের উত্তম রিজিক দান করবেন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোত্তম রিজিকদাতা।’ -হজ : ৫৮।

‘তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে উপাসনা করছ মূর্তির আর রচনা করছ মিথ্যা। তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করছ, তারা তোমাদের রিজিক দেয়ার মালিক নয়। সুতরাং তোমরা রিজিক কামনা কর আল্লাহর কাছে এবং তাঁরই ইবাদত করো, আর তাঁরই প্রতি শোকরিয়া আদায় কর। কারণ তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে।’ -আনকাবুত : ১৭।
‘এমন অনেক জীবজন্তু আছে, যারা নিজেদের রিজিক মজুদ করে রাখে না, আল্লাহই তাদের রিজিক দেন এবং তোমাদেরও। তিনি সর্বজ্ঞ, সব কিছু শুনেন।’ -আনকবাবুত : ৬০।

‘আল্লাহ, তিনিই তো তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের রিজিক দিয়েছেন, তারপর তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন, তোমাদের পুনরায় জীবিত করবেন, তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরিক বানাও, তারা কেউ কি এসবের কিছু করতে পারে? তারা যাদেরকে আল্লাহর শরিক বানায়, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র এবং মহান।’ -রূম : ৪০।

‘হে মানুষ! তোমরা স্মরণ করো তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা। আল্লাহ ব্যতীত এমন কোনো স্রষ্টা আছে কি? যিনি আকাশ এবং পৃথিবী থেকে তোমাদের রিজিক প্রদান করে। কোনো ইলাহ নেই তিনি ছাড়া। সুতরাং তোমরা ভুল পথে চালিত হচ্ছো?’ -ফাতির : ৩।

‘তিনি তোমাদের তাঁর নির্দেশনাবলী দেখান এবং আসমান থেকে নাজিল করেন তোমাদের রিজিক। আল্লাহর অভিমুখী ব্যক্তিই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।’ -মুমিন : ১৩।
‘আল্লাহ যদি তাঁর বান্দাদের অঢেল রিজিক দান করেন, তবে অবশ্যই তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতো। বরং তিনি তাঁর পরিমাণ মতোই নাজিল করেন, যা তিনি চান। তিনি বান্দাদের প্রতি পূর্ণ সতর্ক ও দৃষ্টিবান।’ -আশ শূরা : ২৭।

‘আল্লাহই তো রিজিক সরবরাহকারী, তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রবল ক্ষমতার অধিকারী।’ -যারিয়াত : ৫৮।

‘এবং তাকে রিজিক দেবেন এমন উৎস থেকে, যা তার ধারণাতীত। যে ব্যক্তি তাওয়াক্কুল করবে আল্লাহর ওপর, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেনই। তিনি সব বস্তুর জন্য নির্ধারণ করেছেন পরিমাণ ও মাত্রা।’ -তালাক : ৩।
‘এমন কে আছে, যে তোমাদের রিজিক সরবরাহ করবে; যদি তিনি তার রিজিক বন্ধ করে দেন? বরং তারা অবাধ্যতা ও সত্য থেকে পালানোর ওপর অবিচল রয়েছে।’ -মুলক : ২১।
আল্লাহর নবী বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা ফজর শুরু হওয়া থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করেন।’ বায়হাকী।

আল্লাহর নবী সা. আরো বলেন, ‘সকাল বেলার ঘুম জীবিকা আগমনে বাধা দেয়।’ -আহমদ ও বায়হাকী। আল্লাহর নবী সা. আরো বলেন, ‘হে মানুষ! আল্লাহকে ভয় এবং জীবিকা অন্বেষণে সুন্দর পন্থা অবলম্বন কর। মনে রেখ, কোনো মানুষ তার জন্য বরাদ্দকৃত জীবিকা পুরোপুরিভাবে উপার্জন না করে মারা যাবে না। যদিও কিছুটা বিলম্বিত হয়। অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং সুন্দর পন্থায় জীবিকা উপার্জন কর। শুধু হালাল জিনিস উপার্জন এবং হারাম জিনিস পরিহার কর।’ -ইবনে মাজাহ।

আল্লাহর নবী সা. বলেন, ‘আকাশ ও পৃথিবীতে এমন কোনো ফেরেশতা নেই যে আল্লাহ তায়ালা কোন দিন কী তৈরি করবেন, তা সকাল বেলাই জেনে ফেলে। প্রত্যেক বান্দার জন্য তার জীবিকা বরাদ্দ রয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ও জ্বিন যদি তাকে তার জীবিকা থেকে বঞ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবুও তা করতে পারবে না।’ -তাবরানী।

রাসূল সা. বলেন, ‘সর্বোত্তম জিকির হচ্ছে গোপনে জিকির করা আর সর্বোত্তম জীবিকা হলো, যা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করে।’ -ইবনে হাব্বান।

রাসূল সা. বলেন, ‘আদম সন্তানের যদি দুটি হ্রদের সমান ধন-সম্পদ থাকে, তবে সে তৃতীয় আরেক হ্রদের সমান সম্পদ চায়। আদম সন্তানের পেট মাটি ছাড়া আর কিছুতে ভরবে না। তবে যে তাওবা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন।’ -বুখারী, মুসলিম।
আল্লাহর নবী সা. বলেন, ‘হালাল জীবিকা সন্ধান করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ওয়াজিব।’ -তাবরানী। আল্লাহর নবী সা. আরো বলেন, ‘হালাল জীবিকা সন্ধান করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।’ বায়হাকী।

আল্লাহর নবী সা. বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দা তার পা একটুও এগোতে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে ৪টি প্রশ্ন করা হবে? সে নিজের জীবনকাল কীভাবে কাটিয়েছে, তার যৌবনকাল কীভাবে অতিবাহিত করেছে? নিজের ধন-সম্পদ কীভাবে আয় করেছে, কীভাবে ব্যয় করেছে? নিজের জ্ঞান অনুসারে কী কাজ করেছে।’ -তিরমিযী।কুরআন ও হাদীসের বর্ণনার আলোকে আসুন, আমাদের জীবন পর্যালোচনা করি। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের জীবন দিয়েছেন। শিশুকাল, যৌবনকাল, মধ্যকাল, বৃদ্ধকাল। মূলত রিজিক সবকালেই আমাদের নির্ধারিত। মায়ের কোলে আমরা দুধ পান করি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। বড় হওয়ার সাথে সাথে আয়-উপার্জনের জন্য ছোট বড় সবাই কোনো না কোনো কাজে লিপ্ত হই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না- নির্ধারিত রিজিক আমার জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু তা হালালভাবে না হারাম ভাবে উপার্জন করবে তার স্বাধীনতা প্রত্যকের রয়েছে। আর এই স্বাধীনতার কারণে মানুষ ইচ্ছা করলে হালাল অথবা হারাম পন্থায় উপার্জন করতে পারবে। কিন্তু অবৈধভাবে জীবিকা নির্বাহ করা হারাম। মুসলমানদের উপর হালাল পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করা ফরজ। আর কোন পথে জীবিকা অন্বেষণ করেছো এবং ব্যায় করেছো তা আল্লাহর কাছে হিসাব দেয়া লাগবে। আল্লাহ আমাদের সবাই হেফাজত করুন, আমীন।

লেখক : ফকীহ, সাংবাদিক, জাহাঙ্গীর আলম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here