রমজানে স্বাস্থ্যসম্মত খাওয়া-দাওয়া।”

0

ডা. মো: সাইফুল আলম

দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে রোজার শেষে শরীর, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুকোষ খাবারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শক্তির জোগান চায়। তাই দীর্ঘ সময় পর ইফতারে খাবার হতে হবে সহজ স্বাস্থ্যকর, পুষ্টিকর ও সুষম।

রমজানে স্বাস্থ্যসম্মত ইফতারঃ
ইফতার খাবার সময়কে দুই ভাগে ভাগ করে খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত। মাগরিবের নামাজের আগে কিছুটা আর বাকিটা মাগরিবের নামাজের পর খেতে হবে। কারণ একসঙ্গে বেশী খেলে নানারকম জটিলতা তৈরি করে শরীরকে ক্লান্ত করতে পারে। ইফতার শুরু করতে পারেন শরবত বা ডাবের পানি দিয়ে।

তবে খেয়াল রাখতে হবে, শরবতে যেন চিনি কম হয়।তবে শরবতের মধ্যে চিনি না দিয়ে গুড় দিতে পারেন। ইফতারে অবশ্যই খেজুর খাওয়া উচিত। কারণ, খেজুর শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায়। এতে আছে শর্করা, চিনি, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, কপার, সালফার, ম্যাঙ্গানিজ, সিলিকন, ক্লোরিন ফাইবার, যা সারা দিন রোজা রাখার পর খুবই দরকারি। ভাজাপোড়ার বদলে স্যুপ, দই–চিড়া ইত্যাদি খাওয়া ভালো। মৌসুমি ফল খাওয়া উচিত। এই গরমে যে ফলে পানির পরিমাণ বেশি, যেমন: তরমুজ, বাঙ্গি, আনারস ইত্যাদি বেশি খাওয়া উচিত। ফলের জুস, মিল্ক শেক ইত্যাদিও তৈরি করে খাওয়া যেতে পারে। তবে যারা ভাজাপোড়া খেতে পছন্দ করেন তারা বাসায় তৈরি পরিমাণ মত বিশুদ্ধ তেলে ভাজা পেঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনী, জিলাপি এবং বুট ও মুড়ি রাখতে পারেন।

এছাড়াও খাবারের আইটেমে ভিন্নতা আনতে নুডুলস, সেমাই ইত্যাদি রাখতে পারেন। এছাড়াও প্রতিদিনের ইফতারে টকদই রাখতে পারেন। এটি আপনার শরীরের জন্য খুবই উপকারী। বিশেষ করে এর প্রোবায়োটিক শ্বাসযন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণে কার্যকরী। সালাদা কিংবা ছোলার সঙ্গেও মিশিয়ে খেতে পারেন টকদই।

রমজানে স্বাস্থ্যসম্মত রাতের খাবারঃ

খাদ্য তালিকায় সব ধরনের খাবার থাকতে হবে। যেমন আমিষ, শর্করা, ফ্যাট, ভিটামিন, দুধ, দই, মিনারেলস, ফাইবার ইত্যাদি। রাতের খাবারে ঢেঁকিছাঁটা লাল চালের ভাতের সঙ্গে সবজি রাখতে পারেন।এছাড়াও লাউ, লাউশাক, মিষ্টি কুমড়া, শসা, পটল, ঝিঙে, কচুশাক ও কচু ইত্যাদির ঝোলে তরকারি, এক টুকরা মাছ অথবা এক টুকরা মাংস হতে পারে। দুধ-কলা স্বাস্থ্যসম্মত। চিনিযুক্ত খাবার বাদ দিলে ভালো হয়। প্রতিবেলা মাংস না খেয়ে অন্তত একবেলা মাছ খেতে চেষ্টা করুন।

এই গরমে অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি না খেলে হজমের সমস্যা হবে। তাই ইফতারের পর থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একটু পরপর পানি খেতে হবে।

রমজানে স্বাস্থ্যসম্মত সেহরিঃ
শরীরটাকে সুস্থ রাখার জন্য সেহেরি খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, সেহেরীর খাবার মুখরোচক, সহজ পাচ্য ও স্বাস্থ্য সম্মত হওয়া প্রয়োজন। অধিক তেল, অধিক ঝাল, অধিক চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়া একদম উচিত নয়। অনেকেই মনে করেন যেহেতু সারাদিন না খেয়ে থাকতে হবে, তাই সেহেরীর সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেশি বেশি খাবার খেতে হবে। তা মোটেই ঠিক নয়, কারণ চার পাঁচ ঘণ্টা পার হলেই খাদ্যগুলো পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে গিয়ে হজম হয়ে যায়। তাই প্রয়োজনর তুলনায় বেশি না খাওয়াই ভালো, বরং মাত্রাতিরিক্ত খেলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। ভাত বাঙালির প্রধান খাবার।

তাই সেহরিতে সাদা ভাত রাখতে পারেন। তবে ভাতের সঙ্গে রাখতে হবে উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমনঃ মাছ, মাংস ও ডিম। খরচ কমাতে চাইলে ভাতের সঙ্গে শুধু ডিম ও ডাল রাখতে পারেন। ডাল উদ্ভিজ প্রোটিন বলে এতে ক্ষতিকর চর্বি নেই। সেহরির খাবার তালিকায় যে কোনো একটি সবজি থাকা বাঞ্ছনীয়। ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁপে, করলা, আলু, টমেটো এর কয়েকটি বা যে কোনো একটি রাখলে চলবে। পাকস্থলিতে উত্তেজনা ও অস্বস্তি সৃষ্টি করে এমন কোনো খাবার খাওয়া উচিত নয়।

রমজান মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সহজেই তার স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে, যদি ঠিক ডায়েট অনুসরণ করা হয়।কখনোই শুধু পানি খেয়ে রোজা রাখবেন না। অতিভোজন থেকেও বিরত থাকুন। খাবার ভালো ভাবে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খান, যা আপনার হজমে সহায়ক হবে।

করোনা মহামারীর এই রমজানে নিয়ম মেনে সঠিক খাদ্য গ্রহণ করুন, সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন। সবাইকে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা।