ইরান না যুক্তরাষ্ট্র : কাকে নেবে ভারত?

0
349

বার্তাবিডি২৪.কম নিউজ,২৮ জুলাই ২০১৮,
ভারত বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে গেছে। তারা কাকে বেছে নেবে : ইরান না যুক্তরাষ্ট্রকে? ইরানের পাশে থাকা মানে সস্তায় তেল পাওয়া, মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার পথ বের করতে পারা। আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যাওয়া মনে অস্ত্র পাওয়া, একটি পরাশক্তির নেক নজরে থাকতে পারা। সাম্প্রতিক অতীত পর্যন্ত দুই দেশের সাথেই সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। কিন্তু তা আর হচ্ছে না:

জুনের শেষ সপ্তাহে ভারত সফরকালে জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত মার্কিন দূত ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিকি হ্যালে নয়া দিল্লিকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, ৪ নভেম্বরের মধ্যে ইরান থেকে জ্বালানি আমদানি ব্যাপকভাবে হ্রাস করা না হলে আমেরিকার অবরোধের শিকার হবে ভারত। ইরান থেকে ভারতের তেল ও গ্যাস আমদানি নিয়ে একান্ত আলাপচারিতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কঠোরভাবে কথাটি বলেছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রকাশ্যে আলোচনার সময় তিনি কঠোর হলেও অনেক বেশি সতর্ক ছিলেন। একটি ভারতীয় টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি ঘোষণা করেন, ভারতের ভবিষ্যতের জন্য ও ভারতের ভবিষ্যত সম্পদের জন্য আমরা তাদেরকে ইরানের সাথে সম্পর্ক গড়ার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বলেছি। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের বেশির ভাগ সঙ্ঘাতের পেছনে নেপথ্য শক্তি হলো তেহরান।

ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার ও তেহরানের ওপর আবা অবরোধের পর ভারত স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা জাতিসঙ্ঘের অবরোধ অনুসরণ করবে, কিন্তু কোনো একটি দেশের আরোপ করা বিধিনিষেধ মান্য করবে না।
এই বার্তায় অসন্তুষ্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সাথে সাথে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষমন্ত্রীদের নিয়ে ‘২+২’ সংলাপ বাতিল করে দেয়। জুলাই মাসের প্রথম দিকে বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল। এটি কেন বাতিল করা হলো, সে সম্পর্কে কোনো কারণ প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। ফলে ভারত ক্ষুব্ধ হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভারত এতই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যে ভারত সরকারের পক্ষে এখন আর ওয়াশিংটনের একতরফা পদক্ষেপের ব্যাপারে তার ক্ষোভ প্রকাশ্যে প্রকাশ করতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্র একন ভারতের প্রধান রফতানি বাজার। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ভারতের মোট রফতানির ১৫.৬ ভাগ। গত দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের নিরাপত্তা সম্পর্ক ব্যাপকভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। চীনের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত নানা মাত্রায় উদ্বিগ্ন হয়ে তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করেছে। মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে চীন যে ধরনের কৌশলগগত সম্পর্ক গড়ে তুলছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত। তাছাড়া ভারতের চিরবৈরী পাকিস্তানের সাথে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কও চিন্তায় ফেলেছে ভারতকে। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গোয়াদর বন্দরের জন্য চীন ৫০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে চীন। ভারত মনে করছে, পারস্য উপসাগরে চীনা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য এটি। ভারতের জন্য এটি আরেকটি সমস্যার সৃষ্টি করেছে। তা হলো এসবের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের লড়াই করার সক্ষমতাও বেড়ে যাবে।

ভারত পরমাণু বিস্তাররোধ চুক্তিতে সই না করলেও নয়া দিল্লি ভারতকে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া চীনের বিরুদ্ধে সফলভাবে শক্তি বাড়াতে নিরস্ত্র গার্ডিয়ান সারভেইল্যান্স ড্রোন, বিমানবাহী রণতরীর প্রযুক্তি, এফ-১৮ ও এফ-১৬ জঙ্গিবিমানও ভারতের কাছে বিক্রি করতে চাচ্ছে আমেরিকা।
অবশ্য ওয়াশিংটনের ওপর ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা নির্ভরতার কারণেই ভারতকে ইরানের সাথে সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে সমস্যায় ফেলে দিয়েছে।

গত কয়েক দশক ধরেই তেহরানের সাথে নয়া দিল্লির সম্পর্ক ভালো ছিল। এমনকি শাহের আমলে ইরান ও পাকিস্তান সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থাকলেও ইরানের সাথে সম্পর্ক রক্ষার সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছে ভারত। আবার ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর প্রাথমিক কিছু সংশয় সৃষ্টি হলেও তা দ্রুত অবসান ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় ইসলামাবাদকে খুব ভালো নজরে দেখতে পারেনি তেহরান।
ইরানের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করার অন্যতম লক্ষ্য নিয়ে দেশটি থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি করছিল ভারত। সৌদি আরব ও ইরাকের পর ইরানই হলো ভারতের তেল আমদানির তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। তবে ভারতের লক্ষ্য ছিল অন্য। তেল ও গ্যাস বিকল্প আরো অনেক দেশ থেকেই আমদানি করা যায়।

ইরানের কৌশলগত অবস্থান ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাথে এর সীমান্ত রয়েছে। মধ্য এশিয়ায় বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্যও ইরানের প্রয়োজন ভারতের। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক অবনতি ঘটায় এসব দেশে যেতে পারছে না ভারত।
আবার ইরানের চাবাহার বন্দর ভারতকে কেবল আফগানিস্তান নয়, মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার দারুণ ব্যবস্থা করে দিতে পারে।

কিন্তু এখন ইরানের সাথে সম্পর্ক না রাখার জন্য মার্কিন চাপে বেশ সমস্যায় পড়ে গেছে ভারত। ট্রাম্পের ঘোষণার অর্থ হলো ‘হয় তুমি আমার সাথে কিংবা তার সাথে।‘ ফলে ভারতের সামনে এখন বিকল্প আছে সামান্যই। তবে এটি ওয়াশিংটনের জন্য বুমেরাংও হয়ে যেতে পারে। ভারত যদি যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অবজ্ঞা করে তবে ওয়াশিংটনের পরাশক্তি মর্যাদা খর্ব হয়ে পড়ে।

এমন এক অবস্থায় কী করবে ভারত? খুব দ্রুত তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটু ভুলের জন্য তাকে অনেক বড় খেসারত দিতে হতে পারে।