বিশ্বকাপে বর্ণবাদ ও চ্যাম্পিয়ন পুতিন

0
301

বার্তাবিডি২৪.কম নিউজ ২৮ জুলাই ২০১৮,
রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন একটি ফুটবল দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে।
বিশ্বের বৃহত্তম বৃহৎশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, (অনেক ক্ষেত্রে তার প্রতিপক্ষ) রাশিয়াই এ যুগে ‘সবচেয়ে ভালো ফুটবল খেলছে’। এমনকি, খোদ রাশিয়ায় সদ্য অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় সেমিফাইনালে না উঠেও রাশিয়া এ খেলার ‘অন্যরকম চ্যাম্পিয়ন’।

এবার ফ্রান্সের ঐতিহাসিক বাস্তিল দিবসের পরদিনই ফরাসিরা আরেক বিপ্লব ঘটায়। তবে তা স্বদেশে নয়, বিদেশের মাটিতে। ১৫ জুলাই মস্কোর লুবানিকি স্টেডিয়ামে ফ্রান্স টিম ফুটবল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় সমাপনী অনুষ্ঠানকালের বর্ষণ ফ্রান্সের জন্য যেন প্রকৃতির আশীর্বাদধারা হিসেবে নেমে এসেছিল। অপর দিকে, রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়ার জন্য তা ছিল ফাইনালে পরাজয়ের বেদনায় বর্ষিত অশ্রুজল। ফলে সাবেক যুগোস্লাভিয়াভুক্ত ছোট দেশটির নারী প্রেসিডেন্টের আনন্দে উল্লসিত হওয়ার ইচ্ছাও পূরণ হলো না। তবুও, নব্বই দশকে যুদ্ধ ও ধ্বংসের মাঝে জন্ম নেয়া এই বলকান রাষ্ট্রের জন্য বিশ্বকাপের দ্বিতীয় স্থান অর্জনেইবা কম গৌরব কিসের?

এ দিকে, বিশ্বকাপের জের ধরে এক ধরনের বর্ণবাদ বা বর্ণবিদ্বেষের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে গেল। আর তা করেছে, একসময়ের চরম বর্ণবাদী নাৎসিদের দেশ জার্মানিতে তাদের উদীয়মান উত্তরসূরিরা। ওদের টার্গেট সাধারণভাবে সে দেশের অভিবাসীরা এবং বিশেষভাবে মুসলমানরা। ‘জিতলে জার্মান, হারলে তুর্কি’ এহেন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তারা বাধ্য করেছে জার্মানির ন্যাশনাল সকারস্টার মেসুত ওজিলকে জাতীয় ফুটবল দল ছাড়তে। তুর্কি বংশোদ্ভূত ওজিলকে এবারের বিশ্বকাপে জার্মান টিম হেরে যাওয়ার জন্য সর্বতোভাবে দায়ী করছে উগ্র জাতীয়তাবাদী নব্যনাৎসিরা। তাদের বিদ্বেষপূর্ণ বিষোদগারের একটা বড় কারণ হলো, মেসুত ওজিল কিছু দিন আগে তুরস্কের বহুলালোচিত প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের সাথে ছবি তুলেছেন। পশ্চিমা ন্যাটো জোটের সদস্য হলেও ইদানীং তুরস্কের সাথে পাশ্চাত্য, এমনকি এতদিনের ঘনিষ্ঠ জার্মানিরও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না।

প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অভিবাসী ইস্যু এর কারণ। লক্ষ করার বিষয়- অভিবাসী পরিবারের তরুণদের সুবাদে অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশ এবার ফুটবল বিশ্বকাপে কৃতিত্ব দেখিয়েছে এবং ফ্রান্স এ বছর বিশ্বচ্যাম্পিয়ান হয়েছে অভিবাসী খেলোয়াড়দের ভূমিকায়। ঠিক সে সময়ে জার্মানিতে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রপাগান্ডা এবং নিজেদের ব্যর্থতার সব দায় চাপিয়ে তাদের ‘নন্দঘোষ’ বানানো দেশটির ‘উদার’ ইমেজকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। অপর দিকে, মেসুত ওজিলের পূর্ব পুরুষের দেশ তুরস্কের মানুষ তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং সে দেশে তার নামে সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।

খেলাধুলা হচ্ছে শরীরচর্চার একটি শ্রেষ্ঠ মাধ্যম এবং এটা রাজনীতিমুক্ত বিনোদনের একটি বহিঃপ্রকাশ। এমনটাই আমরা জেনে এসেছি এবং এখনো তাত্ত্বিকভাবে এ ধরনের কথা বলা হয়ে থাকে। বাস্তবে, এসব ভালো কথার আড়ালে অনেক মন্দ কাজও চলছে। তাই খেলা আর শুধু ক্রীড়া বা বিনোদন নেই। এটা পেশাদারিত্বের মোড়কে অনেক সময় নৈতিকতার মড়ক ডেকে আনছে। শুধু বাণিজ্যের ছোবলই নয়, রাজনীতির দূষণও প্লাবিত করছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনকে।

এর একটি নজির হলো, বিশ্বকাপের রানার্সআপ দেশ ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে অপপ্রচার। মাত্র ৪২ লাখ মানুষের দেশ ক্রোয়েশিয়া বিগত নব্বই দশকে স্বাধীন হয়েছিল। এরপর প্রথমবারেই বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। আর এবার তারা চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলেও তা অস্বাভাবিক হতো না। এমন অভাবনীয় সাফল্যে পড়শী সার্বিয়া যেখানে ক্রোয়েশিয়ার প্রশংসা করার কথা, সেখানে সার্বরা যেন হিংসায় জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে সাবেক যুগোস্লাভিয়া রাষ্ট্র ভেঙে যায় এবং এর সর্ববৃহৎ প্রদেশ সার্বিয়া প্রতিবেশী ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া, কসোভো প্রভৃতি যুগোস্লাভ প্রদেশের ওপর দখলদারির লক্ষ্যে গণহত্যাসহ অবর্ণনীয় নৃশংসতায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। কয়েক বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর শেষাবধি সার্বিয়া পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে তার জাতক্রোধ আজো বিলীন হয়নি। এবার যেখানে সার্বিয়া বিশ্বকাপ ফুটবলে পাত্তা পায়নি, সেখানে ক্রোয়েশিয়ার অব্যাহত সাফল্যে সবাই ছিল প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এটা সার্বিয়ার সহ্য হয়নি। তাই ক্রোয়েশিয়া যখন সকার সুপার পাওয়ারকে পর্যন্ত ধরাশায়ী করল, তখন একজন সার্বমন্ত্রী বিষোদগার করলেন ক্রোটদের বিরুদ্ধে!

ক্রোয়েশিয়ার দু’জন খেলোয়াড় খেলতেন ইউক্রেনের একটি বিখ্যাত ফুটবল টিমে। তারা বিশ্বকাপ ফুটবলের শেষ দিকে একটি ম্যাচে জেতার পর বলেছিলেন, এষড়ৎু ঃড় টশৎধরহব. এতে বিশেষ করে রাশিয়া সাঙ্ঘাতিক ক্ষুব্ধ হয় এবং এ কারণে এই দুই ফুটবলারের ভাগ্যে কী ঘটে, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। একে তো এবার বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ রাশিয়া এবং সেখানেই সব ম্যাচের ভেনু, তদুপরি ক্ষুদ্র ক্রোয়েশিয়া রাশিয়ার মিত্র সার্বিয়ার দৃষ্টিতে ‘বেতামিজ দেশ’। কারণ বসনিয়ার মতো ক্রোয়েশিয়াও সার্বিয়ার আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে আবির্ভূত। রাশিয়া তখন সার্বিয়ার হত্যা-নির্যাতন- ধ্বংসতাণ্ডব মিলে দখলদারির যাবতীয় অন্যায়কে মদদ দিয়ে গেছে। রাশিয়া ও সার্বিয়া, উভয়ে স্লাভ জনগোষ্ঠীর দেশ এবং সিরিলিক লিপিতে দুই দেশেরই ভাষা লেখা হয়ে থাকে। সর্বোপরি, ইউক্রেনকে নিয়ে রাশিয়ার পলিটিক্যাল অ্যালার্জি সুবিদিত। কারণ কয়েক বছর আগে ইউক্রেনের মানুষ সে দেশের রুশপন্থী সরকার উচ্ছেদ করেছে। এতে বেজায় ক্রদ্ধ হয়ে রাশিয়া বিখ্যাত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয় এবং মস্কোর মদদে ইউক্রেনের পূর্বাংশে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীরা আজো সক্রিয়। পুতিনদের ‘যুক্তি’ হলো- ক্রিমিয়া অঞ্চলটি ১৯৫৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনকে উপহার দিয়েছিল। কিন্তু অতীতে জার সম্রাট ক্রিমিয়া দখল করে রাশিয়ার অঙ্গীভূত করেছিলেন। তা ক্রেমলিন সচেতনভাবে ধামাচাপা দিয়েছে।

ইউক্রেন ছিল বর্তমান রাশিয়ার পূর্বসূরি সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি সুবৃহৎ ‘প্রজাতন্ত্র’ এবং সর্বাপেক্ষা শস্যসমৃদ্ধ অঞ্চল। সোভিয়েত পরমাণু চুল্লি ছিল ইউক্রেনের চেরনোবিলে, যা ১৯৮৫ সালে বিস্ফোরণের কারণে মহাট্র্যাজেডির জন্ম দিয়েছে। যা হোক, ফিফা শেষ পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়ার উল্লিখিত দু’জন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি। অভিযুক্ত দু’জন বলেছেন, কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে-বিপক্ষে নয়, তারা তাদের সাবেক টিমের কথা মনে করে Glory to Ukraine বলেছিলেন।

জারদান শাকিরি বিশ্বের একজন সুপরিচিত ফুটবল খেলুড়ে। তিনি মুসলিম আলবেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দেশ কসোভোর একজন শরণার্থী পরিবারের সদস্য। কসোভোর স্বাধীনতাকামী জনগণ সার্বিয়ার বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ সংগ্রামের পর অবশেষে নিজেদের রাষ্ট্র কায়েম করেছে। তবে সার্বিয়া এবং তার সমর্থক দেশগুলো কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি আজ পর্যন্ত। বিগত শতকের নব্বই দশকে সার্বদের গণহত্যাসহ চরম বর্বরতার মুখে শাকিরির পিতামহ বাধ্য হয়ে সুইজারল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শাকিরির জন্ম সেখানে এবং তিনি এবার বিশ্বকাপ খেলেছেন সুইজারল্যান্ড টিমের সদস্য হিসেবে। এর একটি ম্যাচে জয়ের পর জারদান শাকিরি এবং তার মতো আরেক ‘কসোভার’ শরণার্থী খেলোয়াড় আনন্দ-উল্লাস করেছেন ঈগলের ভঙ্গিতে। এতেই সার্বিয়া বিষম ক্ষুব্ধ হয় এবং ধরে নেয়া যায়, তার মিত্র রাশিয়াও খুশি হয়নি এতে। ঈগল হচ্ছে আলবেনিয়া রাষ্ট্র, তথা আলবেনীয় জনগোষ্ঠীর জাতীয় প্রতীক। ফিফা শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড় দু’জনকে নিষিদ্ধ করেনি যদিও এমনটাই আশঙ্কা ছিল সবার। সাধারণত বড় দেশগুলোকে নাখোশ করা হয় না এবং বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ হলে তো কথাই নেই। তদুপরি, কসোভো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা এবং জারদান শাকিরিরা সেখানকার মানুষ। অতএব, ঈগলের ভঙ্গি প্রদর্শনের ‘ঔদ্ধত্য’ তাদের জন্য চরম দণ্ডের কারণ হতে পারত।

এবারে ফুটবল বিশ্বকাপে রাশিয়া চ্যাম্পিয়ন হওয়া দূরের কথা, কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছে। তবে পর্যবেক্ষকদের অভিমত, মূলত রাশিয়াই ‘চ্যাম্পিয়ন’ হয়েছে। সেটা সরাসরি সকার টুর্নামেন্টে না হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির একরকম খেলায়ই বটে। সুযোগটা করে দিয়েছে বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়া। উপলক্ষ বিশ্বকাপ ফুটবল হলেও পুতিনের রাশিয়ার লক্ষ্য শুধু মাঠের খেলা ছিল না। এর বাইরে অন্য খেলাও দেশটির সরকার খেলেছে এবং মোটামুটি সফল হয়েছে। এবার একটি ছবিতে দেখা যায়, রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন ফুটবলে লাথি মারছেন। এই প্রতীকী চিত্র তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষের প্রতি তার পদাঘাতের প্রয়াসকে। এতে পুতিন অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন বলে প্রতীয়মান। অপর দিকে, তার প্রধান প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র আমেরিকা কেবল যে, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বেই ঠাঁই পায়নি, তা নয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক হতে পেরেছে- তাও উত্তরের কানাডা আর দক্ষিণের মেক্সিকোর সাথে মিলে। অথচ এবার রাশিয়া এককভাবেই বিশ্বকাপের আয়োজন করেছে এবং এটা করতে পেরেছে আশাতীত সাফল্যের সাথে। রাশিয়ার শাসক মহল, তথা ‘নির্বাচিত একনায়ক’ পুতিনের জন্য এটা বড় একটা বিজয় বৈ কি।

এ বছর রাশিয়ায় বিশ্বকাপের প্রাক্কালে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, বিতর্কিত রাশিয়া কতটা সফল হতে পারবে এই বিরাট কর্মকাণ্ডে? দেশটি গা-গতরে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে দশাসই হতে পারে, কিন্তু এর ইমেজতো ভালো নয়। তা ছাড়া, সকার বা ফুটবল কি তার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা? পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি শীত পড়ে এই রাশিয়াতেই। সাধারণ জ্ঞানের বইতে শীতলতম স্থান হিসেবে সাইবেরিয়ার ভার্খয়ানস্ক নামের যে অসাধারণ স্থানের উল্লেখ আছে, তা রুশ রাষ্ট্রভূমির অন্তর্ভুক্ত। অতীতে হাড় কাঁপানো ‘জাড়’ জার্মানির হিটলার এবং ফ্রান্সের নেপোলিয়নকে রাশিয়া দখল করতে দেয়নি। আজো বছরের সাত মাস বরফে ঢাকা থাকে খোদ রাজধানী মস্কো। এই প্রেক্ষাপটে ফুটবল নয়, ক্রিকেট নয়, আমাদের পরিচিত হকিও নয়, আইস হকি বা বরফের উপযোগী হকিই রুশ জাতির সর্বাধিক প্রিয় ক্রীড়ামাধ্যম। অথচ রাশিয়া কিনা ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন করল। তা-ও ৫০০ থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে দূরে থাকা, ডজনখানেক শহরে।

রাশিয়ার ইমেজ সাম্প্রতিককালে প্রধানত দুই কারণে ক্ষুণœ হয়েছে। এক. পুতিনের কর্তৃত্ববাদী একচ্ছত্র শাসন যাকে বলা যায় ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র’। পুতিন সরকার সমাজতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক নয় এবং প্রহসনমূলক হলেও নির্বাচনের একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়ে থাকে- এ কারণে সাবেক কেজিবি গোয়েন্দা পুতিনের শাসনসিস্টেমটা কথিত গণতান্ত্রিক। সে দেশে মূলত একদলীয় নির্বাচন এবং এক ব্যক্তির শাসন। এ কারণে পুতিনকে বলা হয়, বর্তমান বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষমতাধর শাসক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তো বটেই, কোনো রাজা বাদশা কিংবা জাঁদরেল জেনারেলের শাসিত দেশেও নাকি তার মতো এত বেশি ক্ষমতা কোনো শাসনকর্তার নেই! দুই. ১৯৭৯ সালে সূচিত, আফগানিস্তানে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট আগ্রাসনের স্মৃতি এখন অনেকটাই বিলীন। সেই সোভিয়েত নেই। আফগানিস্তানও অনেক বদলে গেছে। দেশ দু’টিতে এত ঘটনা এরপর ঘটেছে যে, তা আর সোভিয়েতের প্রধান উত্তরসূরি রাশিয়ার জন্য বড় ব্যাপার হয়ে থাকেনি। কিন্তু বছর কয়েক আগে ইউরোপের উল্লেখযোগ্য দেশ ইউক্রেনে রুশ ‘আগ্রাসন’ মস্কোর মুখে নতুন করে কলঙ্কের কাদা লেপে দিয়েছে। ইউক্রেনে ধামাধরা সরকার হারিয়ে দেশটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদে মদদের সাথে, প্রতারণার পথে ক্রিমিয়া জবরদখল রাশিয়ার ইমেজকে আজো বিপন্ন করে রেখেছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্য জগৎ ইউক্রেনের ইস্যুতে রাশিয়াকে ‘গ্রেট ক্রিমিনাল’ মনে করে। এবার বিশ্বকাপের পূর্বলগ্নে ব্রিটিশ মিডিয়ার বিরূপ প্রচারণা এবং তার আগে ব্রিটেনে সাবেক রুশ গোয়েন্দার হত্যা প্রয়াসের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করা হয়েছে। এসব কিছুর মূলে ইউক্রেন নিয়ে গায়ের জোরে মস্কোর মোড়লিপনা।

যা হোক, রাশিয়ার এ ধরনের নেতিবাচক বিষয় থাকার পরও সফলতার সাথে ফুটবল বিশ্বকাপ সম্পন্ন হয়েছে রাশিয়াতেই। বিশ্বকাপে রুশ টিম সেমিফাইনালেও পৌঁছতে পারেনি; তবে রাজনীতি, কূটনীতি, এমনকি পর্যটনসমেত অর্থনীতি আর সংস্কৃতিসমেত আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির দিক দিয়ে পুতিনের রাশিয়া ‘ফাইনালেও সফল’ বলা চলে। ফুটবল বিশ্বকাপের ব্যাপারে সব আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে রাশিয়া নিজে স্বস্তি পেয়েছে। তেমনি অন্যদের আশ্বস্ত করেছে যে, বিরাট কোনো আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান বা কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গতি তার আছে। পাশ্চাত্যের নানা অবরোধ ও অসহযোগিতায় এবং সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারসাজির অভিযোগে বিব্রত রাশিয়ার ইমেজ বিশ্বকাপ ফুটবলের পর এখন অনেকটা উন্নত। এর সাথে বিপুল অর্থনৈতিক বেনিফিট তো আছেই। বহির্বিশ্বে প্রমাণিত হলো রাশিয়া নামের দেশটির ‘ক্যাপাসিটি’; আর দেশের ভেতরে পুতিন নামের শাসক প্রমাণ করলেন রুশ সরকার, অর্থাৎ তার নেতৃত্বের ‘অ্যাবিলিটি’। রাশিয়া সম্পর্কে সঙ্গত-অসঙ্গত কারণে, কিংবা দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলে অনেকের অনেক রকম ধারণা ছিল যার একটা বড় অংশই রুশ জাতি ও ক্রেমলিন সরকারের অনুকূল নয়। এবার বিশ্বকাপের মধ্য দিয়ে তা অনেকটা দূর হয়েছে বলে মিডিয়া জানিয়েছে। পুতিন মনে করেন, এসব কিছুই তার জন্য রাজনৈতিক ফায়দা বয়ে আনবে।

পুতিন ফুটবল রাজনীতিতে যতই কৃতিত্ব দেখান না কেন, তা যদি স্বদেশে তার দুঃশাসনের লৌহনিগড় আরো পোক্ত করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা হবে দুঃখজনক। আর একই কারণে বিদেশে যদি পুতিনের রাশিয়ার আধিপত্যকামী তৎপরতা বেড়ে যায়, তা হবে সত্যিই উদ্বেগজনক।
পাদটীকা : স্পেনের মতো ফুটবল পরাশক্তি বা সকার সুপারস্টারকে পেনাল্টি শুট আউটে হারিয়ে, রুশ বিজয়ের সুপারম্যান বা বিজয়ের নায়করূপে অভিহিত করা হচ্ছে রাশিয়ার গোলকিপার ইগর আকিনফিভকে। কিন্তু তার প্রতি সম্মান দেখাতে গিয়ে মডেল স্থপতি মারিয়া (২৪) শুধু নিজেকে উদোম করেছেন, কোনো ‘সুপার উডম্যান’ হতে পারেননি। এই রুশ তরুণী এটা করে আকিনফিভের মর্যাদা সামান্য বাড়াতে না পারলেও নিজের মর্যাদা হারিয়েছেন অসংখ্য রুচিশীল মানুষের কাছে।

পুনশ্চ : ভাগ্নে- এবার বিশ্বকাপে সোনার মেডেল পাইয়া গেল ফ্রান্স। মামা- হ, আমগো বাংলাদেশেও সোনা কম নাই। তয় এইডা চোরাই পথেই বেশি আহে। ভাগ্নে- এত সোনা আছে। এগুলা দিয়া অনেকগুলা বিশ্বকাপ মেডেল বানাইয়া নিলে ক্ষতি কী?