সিলেটে ভোটের হিসাব-নিকাশ বদলাচ্ছে

0
310

সিলেট প্রতিনিধি,২৯ জুলাই ২০১৮,
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সমর্থনে নতুন এক মেরুকরণ বদলাচ্ছে:

সিলেটে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান মোট ১৮ বছর ছিলেন পৌরসভার চেয়ারম্যান বা সিটি মেয়র। তবে ২০১৩ সালের নির্বাচনে তিনি বেশ বড় ব্যবধানে (৩৫ হাজার ভোটে) হারেন বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে। এবার আবার মুখোমুখি দুজন।

তবে ২০১৩ সালের তুলনায় এবারের ভোটের পরিস্থিতি ভিন্ন, ভোটারদের মধ্যে চাওয়া-পাওয়া আর প্রার্থীদের বক্তব্যও ভিন্ন।

আরিফুল গত পাঁচ বছরে মেয়র হিসেবে নগরবাসীর প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পেরেছেন, সেই বিষয়টি নিয়ে তাকে এবার জবাবদিহি করতে হবে, পাঁচ বছর আগে যা করতে হয়েছে কামরানকে।

এর পাশাপাশি বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াতের আলাদা প্রার্থী দেয়া, ধর্মভিত্তিক দল ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী দেয়া, বিএনপি ও আওয়ামী লীগে অপ্রকাশিত কোন্দল, ‘অভিবাসী’ ভোটসহ নানা বিষয় জয়-পরাজয়ে নির্ধারক হবে। প্রচারের শেষ সময়ে এসে সোমবারের ভোট নিয়ে চলছে হিসাব-নিকাশ।

কামরান, আরিফুল আর জামায়াতের এহসানুল মাহবুব জুবায়ের- তিনজনই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। ঢাকাটাইমসকে কামরান বলেন, ‘চারদিকে নৌকার জোয়ার তৈরি হয়েছে। যেখানেই যাচ্ছি ভালো সাড়া পাচ্ছি। অতীতে দুবার মেয়রের চেয়ারে ছিলাম্। নগরীর উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছি। আশা করছি এবারও জনগণ আমার ওপর আস্থা রাখবে।’

আরিফুল বলেন, ‘জনগণের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। সুষ্ঠু ভোট হলে রায় আমার পক্ষেই যাবে।’

জুবায়ের বলেন, ‘দুই মেয়রকেই মানুষ ভোট দিয়েছে। কিন্ত নগরীর কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। মানুষ এবার পরিবর্তন করে নতুন মুখ দেখতে চায়। আশা করছি মানুষের রায় নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হব।’

‘অভিবাসী’ ভোট

চাকরি ও জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সিলেটে অবস্থান করায় ভোটার তালিকায় এখানে নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন।

ধারণা করা হয়, সিলেটের তিন লাখ ২১ হাজার ৭৩২ জন ভোটারের মধ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রায় ৬৫ হাজার ভোটার আছেন। এ ছাড়া বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের ৩৫ হাজার এবং বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের ১৫ হাজার, বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের অন্তত ১০ হাজার ভোটার আছে বলে তথ্য পাওয়া যায়।

নগরীর মোট ভোটারের অর্ধেকই আঞ্চলিক সমিতিভুক্ত হওয়ায় এই ভোটাররাই সিটি নির্বাচনের মূল ব্যবধান গড়ে দেবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা লোকজনদের নিয়ে সিলেটে রয়েছে তাদের অন্তত ৩০টি আঞ্চলিক সংগঠন। নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে তারা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনেও বেশ তৎপর হয়ে উঠছে এগুলো।

এমন সমীকরণের ফলে প্রার্থীদের সবাই ছুটছেন আঞ্চলিক সমিতির দ্বারে দ্বারে। কামরান ও আরিফুল গত কয়েক দিনে সিলেটস্থ খুলনা, রংপুর বিভাগীয়, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, চট্টগ্রাম, জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা সমিতিসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

সিলেটস্থ খুলনা সমিতির প্রচার সম্পাদক শেখ নাসির ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘দুই মেয়র প্রার্থীই সম্প্রতি আমাদের সংগঠনের সাথে বৈঠক করেছেন। তারা ভোট ও দোয়া চেয়েছেন।’

সিলেটস্থ বৃহত্তর রংপুর সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুবেল আহমদ বলেন, ‘সিলেট নগরীতে রংপুরের ৩০ থেকে ৩৫ হাজার অধিবাসী রয়েছেন। দুই মেয়র প্রার্থীই এই ভোটারদের টানতে আমাদের সাথে মতবিনিময় করেছেন।’

কামরান ও আরিফুল দুজনই বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামাই। এই পরিচয়কেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন তারা। কামরান-পত্মী আসমা কামরান টাঙ্গাইলের আর আরিফ-পত্মী শ্যামা হক ময়মনসিংহের মেয়ে।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুল আলম বাবলু বলেন, ‘এ অঞ্চলের দুই জামাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাই ভোট কিছুটা ভাগাভাগি হতে পারে।’

কামরান-পত্মী আসমা কামরান বলেন, ‘আশা করছি অতীতের মতো সিলেটে বসবাসকারী বৃহত্তর ময়মনসিংহের বাসিন্দাদের ভোট নৌকায় পড়বে। অতীতের মতো সিলেটে বসবাসরত আমার এলাকার সবাই নৌকায় ভোট দেবে। কারণ বদর উদ্দিন কামরান সব সময় তাদের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলেন।’

আর আরিফ-পত্নী শ্যামা হক বলেন, ‘স্বামীর পক্ষে ভোট চেয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছি। বিশেষত নারীদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছি। সবাই আরিফুলের উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা করে ভোট দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সিলেট সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিগত নির্বাচনগুলোতেও প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে আঞ্চলিক এই ভোটারদের বড় ভূমিকা ছিল। এবারও এমনটাই হবে।’

সচেতন নাগরিক কমিটি-সনাক সিলেটের সাবেক সভাপতি ইরফানুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘দুই প্রধান প্রার্থীরই সিলেটের বাইরের ভোটারদের সাথে আলাদা সখ্য আছে। তাই যিনি এই ভোটারদের বেশি কাছে টানতে পারবেন, তার ফলাফলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এসব ভোট।’

জামায়াত কত ভোট পাবে?

বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াত সিলেট অঞ্চলে বেশ প্রভাব রাখে। নিবন্ধন বাতিল হওয়া দলটির একাধিক প্রার্থী উপজেলা পরিষদসহ নানা স্থানীয় নির্বাচনে জিতেছেন। দলটি এবার চেয়েছিল বিএনপি যেন নিজে মেয়র পদে প্রার্থী না দিয়ে তাদের সমর্থন দেয়।

বিএনপি সেই দাবি না মানায় আরিফুল হক চৌধুরীকে চ্যালেঞ্জ করে জামায়াত নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রার্থী হয়েছেন। ভোটের প্রচার শুরুর আগে দলটির নেতা-কর্মীরা দাবি করতেন, তারা জেতার মতো অবস্থানে আছেন। তবে ভোটের প্রচারের শেষ দিকে জামায়াত মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারবে কি না, সেটি এখন নিশ্চিত নয়। তবে তিনি নিশ্চিতভাবেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পাবেন।

২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী এক লাখ সাত হাজার ৩৩০ ভোট পেয়ে জিতেছিলেন। এর আগে ১৮ বছর মেয়র ও পৌর চেয়ারম্যান থাকা কামরান পান ৭২ হাজার ১৭৩ ভোট। অর্থাৎ দুজনের ভোটের ব্যবধান ছিল ৩৫ হাজার।

জামায়াতের মেয়র প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের যত ভোট পাবেন, দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান তত কমে আসবে, এটা নিশ্চিত। কারণ পাঁচ বছর আগে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা ভোট দিয়েছিলেন আরিফুলকেই।

ইসলামী আন্দোলনেও ‘ক্ষতি’ বিএনপির

গত ২৬ ডিসেম্বরে রংপুর, ১৫ মে খুলনা আর ২৬ জুন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটে চমক দেখায় ইসলামী আন্দোলন। কোথাও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে না পারলেও সব জায়গায় ধর্মভিত্তিক এই দলটির প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পায়, সেটা এর আগে কেউ পূর্বানুমান করতে পারেনি।

সিলেটে ইসলামী আন্দোলন যাকে প্রার্থী করেছে, তিনি কোনো ধর্মীয় নেতা বা মাদ্রাসা শিক্ষক নন। তিনি একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সিলেট নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোয়াজ্জেম হোসেন খান এরই মধ্যে ২৩ দফা কর্মসূচি দিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন।

ধর্মভিত্তিক দলের প্রার্থী না থাকলে তাদের অনুসারীরা সচরাচর ধানের শীষেই ভোট দিয়ে আসছেন। ফলে মোয়াজ্জেম যত ভোট পাবেন সেটিও নৌকা আর ধানের শীষের জয়-পরাজয়ের একটা নিয়ামক হতে পারে।

জাতীয় পার্টির সমর্থনে আ.লীগে স্বস্তি

ভোটের প্রচারের শেষ পর্যায়ে এসে শনিবার কামরানকে দেয়া জাতীয় পার্টির সমর্থনে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা বেশ উৎফুল্ল। এতে সিলেটে বসবাসকারী বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার আশা করছে তারা। এই অঞ্চলের ভোটারদের জাতীয় পার্টির প্রতি দুর্বলতা রয়েছে।

বাংলাদেশে যেসব অঞ্চলে জাতীয় পার্টির কিছুটা হলেও অবস্থান আছে, তার মধ্যে সিলেটও আছে। তবে এই নির্বাচনে এখানে মেয়র পদে প্রার্থী দেয়নি দলটি। এবার বিএনপি-জামায়াতের আলাদা নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টির ভোট নৌকার বাক্সে পড়লে ভোটের চিত্র কী হবে, সেটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে