আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্ত প্রায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি

0
1528

মোঃ হাবিব ওসমান, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি ঃ
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলাসহ দেশের গ্রামাঞ্চল থেকে কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে এককালের কৃষাণ-কিষাণীর ধান ভাঙার প্রধান অস্ত্র ঢেঁকি।
অতীতে বাংলার গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ভাতের চাল তৈরীর জন্য কিংবা চালের আটা ভাঙ্গার জন্য ঢেঁকি পাতানো ছিল। যান্ত্রিক যুগে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে ম্লান হয়ে গেছে আগেকার দিনের সেই ঢেঁকি। ৮০/৯০ এর দশকে ঝিনাইদহ এলাকার মানুষ তাদের সারা বছরের ভাতের চাল বাড়িতে পাতানো ঢেঁকিতে ছেঁটে প্রস্তুত করত এবং ভাদ্র মাসে ও প্রতিটি পর্বে তালের বড়া, পিঠা খাওয়ার জন্য বাড়িতে বাড়িতে আটা কোটার ধুম পড়ে যেত। আমন ধান কাটা শেষে পৌষ, মাঘে ঢেঁকিতে ধান ভাঙার শব্দে অনেকের রাতের ঘুম নষ্ট হতো। চাল কোটার জন্য মহিলার পাশাপাশি পুরুষরাও ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে থাকত। দু’জন মহিলা ঢেঁকিতে পাড় দিত আর একজন ঢেঁকির আগায় বসে শুকনো ধানগুলোকে ভাঙ্গার গর্তে এগিয়ে দিত। এভাবেই সারা রাত ধরে গ্রামের গৃহবধূরা তাদের সারা বছরের চাল ঢেঁকিতে ছেঁটে মাটির কুঠি কিংবা বাঁশের তৈরী ডোলে ভরে সংরক্ষণ করে রাখত। সে সময় ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত খেয়ে অধিকাংশ মানুষই সুস্থ জীবনযাপন করত। বর্তমানে আধুনিক যুগে চাকচিক্কের আধিক্যে হারিয়ে গেছে সেই ঢেঁকি ছাঁটা চাল। আগের দিনে গ্রাম বাংলার তরুণী-নববধূ ও কৃষাণীদের কণ্ঠে ‘ ও বউ চাল ভাঙ্গে রে , ঢেঁকিতে পাড় দিয়া , নতুন চাল ভাঙ্গে হেলিয়া দুলিয়া , ও বউ চাল ভাঙ্গে রে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া’ এ রকম গান আর শোনা যায় না। অগ্রহায়ণ – পৌষ মাসে কৃষক ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে কৃষাণীদের ঘরে ধানের নতুন চাল ভাঙ্গা বা চাল গুঁড়া করা, আর সে চাল দিয়ে পিঠা, পুলি , ফিরনি , পায়েশ তৈরী করার ধুম পড়ে যায়। এছাড়াও নবান্ন উৎসব , বিয়ে, ঈদ ও পূজায় ঢেঁকিতে ধান ভাঙ্গে আটা তৈরীর সময় গ্রাম্য বধূরা গান গাইতে থাকেন।
চারদিকে পড়ে যায় হৈ-চৈ। কালের বিবর্তনে ঢেঁকি এখন যেন শুধু ঐতিহ্যের স্মৃতি। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি আগের মত আর চোখে পড়ে না। এক সময় ছিল ঢেঁকি গ্রাম জনপদে চাল ও চালের গুঁড়া – আটা তৈরীর একমাত্র মাধ্যম। বধূরা কাজ করতো গভীর রাত থেকে ভোর সকাল পর্যন্ত। এখন ঢেঁকির সেই ধুপধাপ শব্দ আর শোনা যায় না। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ জনপদের কাঠের তৈরী ঢেঁকি। প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চলে যেখানে বিদ্যুৎ নেই , সেখানেও ঢেঁকির ব্যবহার কমেছে। তবুও গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে কেউ কেউ বাড়ীতে ঢেঁকি রাখলেও তারা ব্যবহার করছে না। তবে আবার কেউ কেউ দরিদ্র নারীদের দিন মজুরী দিয়ে ঢেঁকিতে ধান- চাল বা আটা তৈরী করতে দেখা গেছে। সেখানে একটু হলেও ধুপধাপ শব্দ শোনা গেছে। ঢেঁকি শিল্প হলেও এ শিল্পকে সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ নেই।
এক সময় ঢেঁকি শিল্পের বেশ কদর ছিল। যখন মানুষ ঢেঁকিতে ধান ও চাল ভেঙ্গে চিড়া – আটা তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তবে কৃষকের ঘরে এখন আর ঢেঁকি চোখে পড়ে না। তেল-বিদ্যুৎ চালিত মেশিন দিয়ে ধান ও চাল ভাঙ্গার ফলে ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে। সে সময়ে কবি-সাহিত্যিকগণ ঢেঁকি কে নিয়ে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। আর ঢেঁকি ছাঁটা আউশ চালের পান্তা ভাত পুষ্টিমান ও খেতে খুব স্বাদ লাগতো। বর্তমান প্রজন্ম সে স্বাদ থেকে বঞ্চিত। প্রাচীনকালে ঢেঁকির ব্যবহার বেশী হলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে গ্রাম বাংলার ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে!
বর্তমান যুগে কালের আবর্তনে গ্রামবাংলার হতে হারিয়ে গেছে সেই পুরনো দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাঠের তৈরী ঢেঁকি। আর কিছু দিন পরে নতুন প্রজন্ম হয়ত ঢেঁকির কথা শুনলে বলবে সেটি কি জিনিস তা বুঝানো মুশকিল হয়ে পড়বে। তাই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকিকে স্মরণ করাতে হলে জাতীয় যাদু ঘরে ঢেঁকি সংরক্ষণ করে রাখা উচিত বলে গ্রাম এলাকার অনেক অভিজ্ঞ ব্যক্তি মনে করেন।