যশোরের হাজরাখানা বলুর মেলা এ অঞ্চলের সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে

0
408

রিয়াজুল ইসলাম যশোর,

যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাজরাখানা গ্রামের কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত হজরাখানা বলুর মাজার। নদীর পাড়ে উঁচু ঢিবি। তারই উপর এ অঞ্চলের বিখ্যাত পীর বলুদেওয়ানের মাজার। স্থানীয় লোকে এটিকে ’রওজা শরীফ’ বলে আখ্যায়িত করে। এখান থেকে সোজা পশ্চিম দিকে কিছু দুর এগুলেই গ্রামের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। মাঝে মাঝে আম কাঁঠাল গাছ আর বাঁশ ঝাড়। এরই মাঝে ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবারে বসে বিশাল এক মেলা। স্থানীয় লোকে এটিকে ”বলুর বাজার” বলে জানে। বাইরে অবশ্য ”বলুদেওয়ানের মেলা ” নামেই পরিচিত। এবার মেলা চলবে ১০ দিন

এলাকার জনগন পীরের নামে পণ্য সামগ্রী নিয়ে তাঁর মাজারে হাজির হতে থাকে বিশেষ একটি দিনে-পীরের মৃত্যু দিনে। ফলে বেশ কিছু লোকের সমাগম হয় এখানে। এই সুযোগে গ্রামের ময়রারা মিষ্টান্ন দ্রব্য নিয়ে দোকান দিয়ে বসে। তারপর একে একে অনেক ধরনের পণ্য সমগ্রীর সমাগম ঘটতে থাকে এই বিশেষ দিনে। এ ভাবে এটি রূপ নেই মেলা আকারে। পরে যে কোন কারণে মেলাটি স্থানানত্মরিত হয় পেটভরা গ্রামে। এখানেও দেখা দিল সমস্যা। পূণরায় এটা স্থানানত্মরিত হয়ে হাজরা খানা গ্রামের ”পীর বলুদেওয়ান দাখিলা মাদ্রাসা” প্রাঙ্গণে আসে। আর একবার সমপ্রসারিত হয়ে মেলাটি বর্তমান জায়গায় আসে। বর্তমানে একটি কমিটির মাধ্যমে এ মেলাটি সুষ্টভাবে পরিচালনা করা হয়ে থাকে। এ মেলাটি আজ এ অঞ্চলে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে । চৌগাছা উপজেলার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ছাড়াও ঢাকা,ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, সতক্ষীরা , নড়াইল, মনিরামপুর,কেশবপুর, যশোর প্রভৃতি আঞ্চল হতে মানুষের সমাগম ঘটে এখানে। দোকানীরা ট্রাক, ভ্যান এবং অন্যান্য যানবহনে করে তাদের পণ্যদ্রব্য নিয়ে মেলার আগের দিন হাজির হয়। অনেকে রাতের বেলা দোকান প্রস্তুতে ব্যসত্ম থাকে। আশ-পাশের গ্রামেই তারা ঐ রাত্রে অবস্থান করে। পরদিন সকালবেলা পণ্য দ্রব্য সাজিয়ে নিয়ে বসে । চারিদিক থেকে লোকের সমাগম ঘটতে থাকে। অনেকের হাতেই থাকে পীরের নামে মান্নত করা দ্রব্য সমগ্রী। আবার অনেকে খালি হাতেই আসে। এ গ্রামে পৌছে তারা তাদের দ্রব্যগুলি পীরের মাজারে অর্পণ করে পরে মেলায় যায়। যারা খালি হাতে যায় তারা সরাসরি মেলায় হাজির হয় । মেলার আকর্ষণীয় জিনিষগুলির মধ্যে যেগুলি দর্শকের মন কেড়ে নেয় সেগুলি হল মাটির পুতুল, রঙিন হাড়ি বাটি, ছেলেমেয়েদে খেলনা, বেলুন,কাঠের তৈরি আসবাব পত্র প্রভৃতি। এ ছাড়াও মাছ তরকারী থেকে শুরু করে সকল প্রকারের জিনিষপত্র ওঠে এই মেলাটিতে এমন কি কেউ যদি চুল ছাটাতে চায় তবে তাও সম্ভব। পীরের এই মৃত্যু দিবসে বিভিন্ন আঞ্চল হতে আগত ভক্তবৃন্দ মাজার শরীফে এক মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেন। এবং পীরের রম্নহের মাগফেরাত কামনা করেন। এ ছাড়াও মাজারে আগত খাদ্যদ্রব্য মেহমানদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

মেলাটি আজ এ অঞ্চলের সংস্কৃতিতে এক ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। হাজরাখানা এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকেরা মেলা উপলড়্গে তাদের মেয়ে জামাই নিয়ে আসে, দেয় নতুন পোশাক । ঈদের সময় মেয়ে জামাই না আনলেও মেলার সময় অবশ্যই আসতে হবে । এর কোন রকম ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখানকার লোকেরা বলে এই পীরের অছিলায় এ গ্রামে কোন বড় রকমের মহামারী হয় না।

এ মেলাটি যেমন প্রচুর লোকের মনে আনন্দ দেয় তেমনি আবার কিছু কিছু ঘটনা তাদেরকে পীড়া দেয় । মেলার দিনে অনেক লোকের সমাগম ঘটে বিধায় কিছু কিছু উচ্ছ্রঙ্খল ছেলেরা মেলায় আগত মেয়েদের উত্যাক্ত করে। এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। তাদেরকে মনে রাখা দরকার যে , এ মেলাটি একটি পবিত্র দিনে বসে যেদিন একজন প্রখ্যাত আউলিয়ার মৃত্যু ঘটে। মেলাটির আর একটি খারাপ দিক হলো এখানে অনেক জুয়া খেলার আসর বসে, যা সমাজ বিরোধী কাজ বলে আমরা জানি । এ ধরণের কর্মকাান্ড ঘটতে দেওয়া মোটেও উচিৎ নয় ।

আমাদের আলোচ্য বলুদেওয়ানের মেলাটি এ অঞ্চলোর লোকমুখে সর্বাধিক আলোচিত পীর বলুদেওয়ানের মৃত্যু বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় । পীর বলুদেওয়ান অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। লোক মুখে শোনা যায় তিনি যা বলতেন তাই হতো । কিন্তু তাঁর জীবন কাহিনী তেমন কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য আজ আর পাওয়া যায় না । আর যা কিছু পাওয়া যায় তার সমপূর্ণ টাই কিংবদনতীতে ভরা। জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত তার জীবনের প্রতিটি ঘনাই রহস্যের জালে আবৃত। লোক মুখে শোনা যায় তিনি যাাত্রাপুর গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম গস্খহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল ছুটি বিশ্বাস তবে জন্মকাল তেমন কোন নির্ভর যোগ্য তথ্য আজ আর পাওয়া যায় না । স্থানীয় বয়ঃবৃদ্ধ ব্যক্তিবর্গের অনুমান- তিনি ৩/৪ শো বছর আগে জস্মেছিলেন। কেউ কেউ বলেন জন্মবার অল্প কাল পরোই তাঁর পিতা মারা যান । আবার অনেকের মতে তাঁর পিতা অনেক দিন বেঁচে ছিলেন । এই দুটি মত তাঁর জীবন কাহিনীকে দুটি খাতে প্রবাহিত করেছে।

দ্বিতীয় মতানুসারে-বলুদেওয়ান ছেলেবেলা এমন সব আচরণ করতেন যে গ্রামের লোকে তাঁকে পাগল বলো আখ্যায়িত করত। তিনি তাঁর পিতার একমাত্র সন্তান ছিলেন । তাই পিতা একদিন দৃঃখ করে বলেছিলের ”আল্লা তুমি আমার একটি মাত্র ছেলে দিলে তাও দিলে পাগল!’পিতার এরূপ দুঃখ প্রকাশের পর পরই তাঁর ভিতর যে অলৌকিক ড়্গমতা ছিল তাঁর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তার এ অলৌকিক ড়্গমতার বহিঃপ্রকাশ যে কিভাবে ঘটে তাঁর জন্মস্থান যাত্রাপুরা ধোপাদী প্রভৃতি গ্রামে একটি কিংবদনত্মীা প্রচলিতত রয়েছে বলুর বয়স যখন ১০/১২ বছর তখন একদিন তার পিতার কাছে আব্দার জানায় যে সে মাঠে গরু চরাতে যাাাবে। পিতা প্রথমতঃ রাজি হতে চাননি । পরে ছেলের আব্দার পৃূরণ করতে না পারায় রাজি হন । অনুমতি পেয়ে সে যায় গরু চরাতে। মাঠে যেয়ে গরু গুলি লোকের ক্ষেতে মধ্যে দেয় ছেড়ে। গরম্লি তখন মনের আনন্দে পরের ড়্গেতের ফসল খেতে শুরম্ন করে। গ্রামের লোকেরা এসে তার পিতার নিকট দেয় নালিশ। পিতা তখন একজন রাখালকে দিয়ে গরম্ন চরাবার সিদ্ধানত্ম নেন । বলু পিতার এ সিদ্ধানেত্মর কথা শুনে পরদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে গরম্ন নিয়ে মাঠে যায় এবং পূর্বের মত পরের ড়্গেতে ছেড়ে দেয়। গ্রামে লোক এবার তার গরম্নগুলি খোয়াড়ে দিবার জন্য ধরতে যায়। এমন সময় বলুর ইশারায় গরম্নগুলি কতগুলি বক পাখি হয়ে পার্শ্ববর্তী গাছে যেয়ে বসে। সবাই হতবাক হয়ে যায় এবং বলু যে একজন সাধারণ মানুষ নয় তা বুঝতে পারি। চারিদিকে ই ঘঁটনা ছড়িয়ে পড়ল। দেশ দেশানত্মর থেরক লোকের সমাগম হতে লাগল । এ সময় সে তার জন্মভ্থমি যাত্রাপুর ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধানত্ম নেয় । কিন্তু তার পিতা তাকে যেতে দিলেন না । গ্রামের কোন একটি স্থানে তার একটি আসত্মানা তৈরী করে দেন । বলু কিছুদিন এখানি অবস্থান করে। তারপর এ স্থান ত্যাগ করে অন্যদিক

যাহোক তাঁর এই অলৌাকক ক্ষমতার প্রকাশ ঘটার পর পিতার অনুরোধে কিছুদিন যাত্রাপুর অ্‌বস্থান করে, পরে ধোপাদী গ্রামে য়েয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। এখানে আসার পর একই ভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য মানুষের ভীড় জমতে থাকে তার কাছে। অনেকেই তার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়। এ সময় তিনি বশির শাহ্‌ নামক ব্যক্তিকে দীক্ষা দেন। তিনিও বলুদেওয়ানের মত ক্ষমতা প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি এ স্থান ত্যাগ করে বেশ কয়েকটি স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন, যেমন- মুক্তদাহ, যশোর, ভেন্নাবেড়ে ও ভারতের পশ্চিম বাংলার কয়েকটি স্থান। এ সকল স্থানে আজও একটি করে দরগাহ রয়েছে। সর্বশেষে অবস্থান নেন তার মামা বাড়ীর গ্রাম হাজরাখানায়। এবং এখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মেলার সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয়, যশোর জেলার নবাগত পুলিশ সুপার মইনুল হকের সাথে,তিনি বলেন আমি শুনেছি আজ থেকে মেলা শুরু।মেলাই কোন রকম জো খেলা লটারি এবং আইনশৃঙ্খলা অবনতি হবে এমন কাজ করতে দেওয়া হবে না।