চৌগাছায় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যটি যেন চেতনার মূর্ত প্রতীক

0
491

(মো: ইয়াকুব আলী)

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য নির্মিত হয়েছে ছায়াছবি, নাটক, গল্প, কবিতা। সৃজনশীল চেতনায় তুলির আঁচড়ে উঠেছে চিত্রকর্ম। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বাংলা দেশাত্ববোধক গানের ছন্দ সুরে প্রাণ অনুরণিত হয়। বিদগ্ধ ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে বিভিন্ন ভাস্কর্যে। গর্বিত হৃদয়ে গাঁথা রক্তঝরা লাল সবুজ পতাকার পরিচিতির কাজ দেখে-শুনে এমনকি পাঠ করে সাহসী হয়ে ওঠেন নতুন প্রজন্ম।
তেমনি যুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে চিত্র ও ভাস্কর শিল্পী আতিয়ার রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যটি উপজেলার প্রাণ কেন্দ্রে এক মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেশ পাহারায় সদা জাগ্রত এক সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধা জানান দিচ্ছে, আমরা মরি নাই। আমরা তোমাদের চেতনায় জেগে আছি। আর বলছে..ওহে বন্ধু রক্তের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করেছি। তাই দেশকে তোমরা ভালোবাসো।
চৌগাছা বাজারের প্রাণ কেন্দ্রে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্যটি সকলের দৃষ্টি কাড়ে। দৃষ্টিনন্দন এই ভাস্কর্যটি আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে স্মরণ করে দেবার জন্যই এটি নির্মিত হয়েছে। বিশ্ববরেণ্য শিল্পী এস এম সুলতানের ছাত্র শিল্পী আতিয়ার রহমান এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন।
শিল্পী আতিয়ার রহমান জানান, ২০০৮ সাল থেকে তার অন্তরে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য শিল্পী সত্ত্বা জাগ্রত হয়েছিল। প্রথমে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার প্রতিফলন ঘটান সুনিপুণ পেনসিলের স্ক্যাচে। সেই ভাস্কর্যের স্ক্যাচ নিয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বহুবার ধর্ণা দিয়েছেন। বুঝিয়েছেন চৌগাছার রক্তঝরা মাটিতে নতুন প্রজন্মের জন্য ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু সহযোগিতার পরিবর্তে ভৎসনা আর অপমানিত হয়েছেন এই শিল্পী। ফলে নিজের কাছে দগ্ধ হয়েছেন বারংবার।
এরপর ২০১০ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মাটি খুঁড়ে ভাস্কর্য নির্মাণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন উপজেলা চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা এস এম হাবিবুর রহমান ও সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা এম সাখাওয়াৎ হোসেন। প্রথম পর্যায়ে ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য শিল্পীর সাথে সাহসী ভূমিকা পালন করে চৌগাছা রিপোর্টার্স ক্লাব।
ফান্ড গঠনের লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন লোকজনের নিকট গিয়ে টাকা সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু টাকা সংগ্রহ করার প্রয়াসটি থমকে যায়। কেননা ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য মোটা অংকের টাকা এভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় শিল্পী আতিয়ার রহমানের এ কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেবার জন্য সাবেক সংসদ সদস্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী মরহুম মোস্তফা ফারুখ মোহাম্মদ ২০১১ সালে টিআর ও কাবিখার প্রকল্পের বরাদ্দ দেন। এ ছাড়া জেলা পরিষদও সহযোগিতা করেন।
ধীরেধীরে কয়েক বছরের মধ্যে ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়। শুধুমাত্র পানির ফোয়ারাটি এখনো নির্মাণ করা হয়নি। তারপরও জনগণের কথা চিন্তা করে এই ভাস্কর্যটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
শিল্পী আতিয়ার রহমান জানান, ভাস্কর্যটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্যটির উচ্চতা ত্রিশ ফুট। ভাস্কর্যটি তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছে। মূলত ত্রিভূজ আকৃতির চত্বর। বৃত্তাকার পানির ফোয়ারার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসবে ভাস্কর্যের মূল স্তম্ভ।
প্রথম স্তরে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, যুদ্ধে গণহত্যার পৈচাশিকতার চিত্র এবং পাকিস্থানীদের পরাজয় দৃশ্য-আত্মসমর্পণ। দ্বিতীয় স্তরে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠদের প্রতিকৃতি। শেষ স্তরে অর্থাৎ উপরে আছে অসংখ্য জনতার প্রতীক একজন দুঃসাহসিক মুক্তিযোদ্ধা। যার এক হাতে হুঁশিয়ারি উচ্চরণ করা দেশ প্রেমের রাইফেল, অন্যহাতে শান্তির প্রতীক পায়রা। আসলে মুক্তিযোদ্ধারা কখনো মরে না। যুগেযুগে কালেকালে মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের চেতনায় বেঁচে থাকবেন।
এ বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা এস এম হাবিবুর রহমান বলেন, সরকারের ঘোষণার আগে থেকেই আমরা ভাস্কর্যটি নির্মাণের পরিকল্পনা করি। যেহেতু চৌগাছাকে স্বাধীনতার প্রবেশদ্বার বলা হয়। সেকারণে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমি শিল্পী আতিয়ারের সাথে পরামর্শ করে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই ভাস্কর্যের বিষয়ে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। নানাভাবে টাকা জোগাড় করা হয়। ভাস্কর্যে পানির ফোয়ারাটি দ্রুত সময়ের মধ্যে হাত দেওয়া হবে।
যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. মনিরুল ইসলাম মনির জানান, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী মরহুম মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদের টি আর কাবিখা প্রকল্পের টাকা ও জেলা পরিষদের টাকায় এটি তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের সরকারি ঘোষণার পর, সংসদ সদস্য হিসাবে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে এলাকার কয়েকটি প্রস্তাবনা পাঠায়। সেখানে চৌগাছার ঐতিহাসিক মুক্তিনগর ও রামকৃষ্ণপুরের বধ্যভূমির জন্য ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। আশা করা যায় অচিরেই কাজ শুরু হবে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছতে হবে। আর সেই কাজটি বর্তমান সরকার চালিয়ে যাচ্ছে।