ফের এরশাদ-রওশন দ্বন্দ্ব

0
349

বার্তাবিডিডেস্ক নিউজ:
একাদশ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং তার স্ত্রী ও দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের মধ্যে আবারো দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। তারা দুইজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেছেন। এ ছাড়া নির্বাচনকালীন সরকারে মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য সদস্যের আলাদা তালিকাও দিয়েছেন তারা। শুধু তা-ই নয়, এই দ্বন্দ্বের কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পূর্বঘোষিত ৬ অক্টোরের মহাসমাবেশও হচ্ছে না। নির্বাচনের আগমুহূর্তে দলের শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে এই কোন্দলের কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

জাতীয় পার্টির শীর্ষ দুই নেতার এই দ্বন্দ্ব বেশ আগে থেকেই চলছে। বিভিন্ন সময় তারা একত্র হলেও আবার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন। তাদের এই দ্বন্দ্ব অবশ্য প্রতিবার জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে তৈরি হয় এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ২০০৬ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর এরশাদের সঙ্গে রওশনের বিরোধ শুরু হয়। বিরোধের একপর্যায়ে এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিষ্কার করে নিজেই জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন এবং বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহকে মহাসচিব করেন রওশন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে সে নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে যায়। পরে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসনে ভোট করে পরাজিত হন রওশন। এরপর অবশ্য এরশাদের ছেড়ে দেওয়া রংপুর-৩ আসন থেকে উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

তাদের মধ্যে আবারো দ্বন্দ্ব দেখা দেয় দশম সংসদ নির্বাচনের আগে। এরশাদ ওই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও রওশন তাতে যাওয়ার ঘোষণা দেন। নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর এরশাদকে বারিধারার বাসভবন থেকে সিএমএইচে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০১৪ সালের ১০ জানুয়ারি হাসপাতাল থেকে সংসদে এসে শপথ গ্রহণ করে আবার সিএমএইচে চলে যান তিনি। এর দুই দিন পর ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর বারিধারায় বাসায় চলে যান এরশাদ। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হন রওশন এরশাদ। পরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সংরক্ষিত মহিলা আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। দুজনই আলাদা তালিকা করে সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন দেন। তবে সেখানে এরশাদ পরাজিত হন এবং রওশনের তালিকা কার্যকর হয়। এরপর জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করায় রওশনপন্থিরা এরশাদকে চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য আবারো এরশাদ-রওশন এক মঞ্চে আসেন।

সর্বশেষ গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এইচএম এরশাদ। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এমপি, কাজী ফিরোজ রশীদ। দুই ঘণ্টা বৈঠকের পর এরশাদ নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন বাবলু ও কাজী ফিরোজ রশিদের নাম দেন। ওই বৈঠকের বিষয়টি জানতেন না বিরোধীদলীয় নেতা ও দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। তাকে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এরশাদের দেখা করায় ক্ষুব্ধ হন রওশন। ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভার জন্য মশিউর রহমান রাঙা, ফখরুল ইমাম ও এক নারীর নাম দেন। একই সঙ্গে বগুড়া-৬ আসনের এমপি নুরুল ইসলাম ওমরকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ করার প্রস্তাব দেন। শুধু তাই নয়, গত ১৮-১৯ সেপ্টেম্বর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় দুই দিনব্যাপী জাতীয় পার্টির ডিজিটাল নির্বাচনী প্রচারণার কর্মশালায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি রওশন এরশাদকে। এ কারণে দলের অধিকাংশ সংসদ সদস্য এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য ওই কর্মশালায় অংশ নেননি। বিষয়টি ওই কর্মশালায় নেতাকর্মীদের চোখে পড়ে।

এই প্রসঙ্গে জাপার সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, ‘এরশাদ আমাদের নেত্রী রওশন এরশাদকে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। পরে প্রধানমন্ত্রী ১৯ সেপ্টেম্বর আমাদের নেত্রীকে ডেকে সাক্ষাৎ দেন। বৈঠকে আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা, নির্বাচনকালীন মন্ত্রী এবং দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়।’

দলের দুই শীর্ষ নেতার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা বৈঠক প্রসঙ্গে জাপা মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান হিসেবে পল্লীবন্ধু এরশাদ এবং বিরোধী দলের নেতা হিসেবে রওশন এরশাদ আলাদাভাবে দেখা করতেই পারেন। এখানে দোষের কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।’ সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপার শীর্ষ দুই নেতার আলাদা বৈঠক প্রসঙ্গে দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, ‘এটি অস্বাভাবিক নয়, তবে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রী বানানোর জন্য দুইজন আলাদা তালিকা দিলে সেটি অবশ্যই ভাববার বিষয়। দলের চেয়ারম্যান যেখানে নির্বাচনকালীন সরকারের তালিকা দিয়েছেন সেখানে অন্যজনের আলাদা তালিকা দেওয়া দুঃখজনক।’