ঠাকুরগাঁওয়ের ভাষা সৈনিক আকবরের একাকী দিন কাটছে

0
58

রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতাঃভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পর এখনো সরকারি স্বীকৃতি পাননি ঠাকুরগাঁও জেলার ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আকবর হোসেন। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি সর্বস্তরের মানুষ পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণ করলেও কেউ কখনো খোঁজ নেয়নি আকবর হোসেনের।

আকবর হোসেন ১৯৫২ সালে ঠাকুরগাঁও বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি ও হত্যার খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে ঠাকুরগাঁওয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন ছাত্ররা। ২২ ফেব্রুয়ারি হওয়া সেই আন্দোলনে স্কুলছাত্র আকবর হোসেন ছিলেন অন্যতম।

জানা গেছে, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পর দিন কালো পতাকা নিয়ে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন ঠাকুরগাঁওয়ের ছাত্ররা। এর ক’দিন পর পাকিস্তানের এক মন্ত্রী ঠাকুরগাঁওয়ে আসেন। মন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সেদিন ছাত্ররা আবারো রাস্তায় নামেন। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে তারা মন্ত্রীর গাড়ি অবরোধ করে। এসময় পুলিশ ফজলুল করিম নামে এক ছাত্রকে আটক করে। তবে দুঃখের বিষয়, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানে না ঠাকুরগাঁওয়ে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।

৮৬ বছর বয়সী আকবর হোসেন ভাষা আন্দোলনের জীবন্ত এক উদাহরণ। তবে এখনও তিনি ভাষা সৈনিক হিসেবে কোনো স্বীকৃতি পাননি। আগে ভাষা দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জেলা উদীচী থেকে আমন্ত্রণ পেলেও এখন কেউ তার খোঁজ নেয় না।

মুক্তিযুদ্ধের সময়েও আকবর একজন সংগঠকের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিলেন বেশ প্রশংসিত। ১৯৯৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দক্ষতা ও সততার কারণে পেয়েছিলেন দেশসেরা পুরস্কার। জেলায় বেশ সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে।

ব্যক্তি জীবনকে বিয়ে করেননি আকবর হোসেন। নিকট আত্মীয়রাও নিজ নিজ সংসারে ব্যস্ত। তাই শহরের হাজিপাড়ার বাসায় একাই থাকেন তিনি। গৃহকর্মী সুফিয়া খাতুন রান্নাবাড়া ও ওষুধ খাওয়ানোর কাজটি করেন। সারাদিন বই পড়ে ও টেলিভিশনের সংবাদ দেখেই এখন দিন কাটছে তার। এমন অবস্থায় তার খোঁজ নেয়নি নিজ দলীয় কোনো সহকর্মী, সরকারি কোনো দপ্তর।

রাইজিংবিডির সঙ্গে আলাপকালে আকবর হোসেন বলেন, ‘আমার মনে পর ভাষা আন্দোলনের সময় মনসুর আলী ও ফজলুল করিমসহ আমরা কয়েকজন ছাত্র একত্রিত হয়েছিলাম। আগে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমি ফুল দিতে যেতাম। তখন নিজের সেই কিশোর বয়সের কথা মনে পড়তো।  সেই মুহূর্তে মনে পরে ভাষা আন্দোলনের একটি অংশে আমরাও ছিলাম। তাই বেশ ভালো লাগে। কিন্তু এখন আর ফুল দিতে শহীদ মিনারে যেতে পারি না। তাই টেলিভিশনের পর্দায় এই অনুষ্ঠান দেখার অপেক্ষায় থাকি।’

তিনি বলেন, ‘কেউ খোঁজ না নিলেও আমার মনের ভেতর কোনো ক্ষোভ বা কষ্ট নেই। কখনো কোনো স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য চেষ্টাও করেনি। এখন একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। তবে কেউ কখনো খোঁজ নিতে বাসায় আসলে আমার খুব ভালো লাগে।’

ঠাকুরগাঁওয়ে ভাষা আন্দোলনের বিষয়ে কথা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুল লতিফের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি ভাষা আন্দোলনের সময় ঠাকুরগাঁওয়ের হাই স্কুল ও হোস্টেলে থাকা কিছু ছাত্র সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলো। তারা একাধিকবার কালো পতাকা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে। সে সময়ের আন্দোলন পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার দমনে এই জেলার মানুষকে সাহস এনে দিয়েছিল।’

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘অজানা কারণে ঠাকুরগাঁওয়ে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জেলা প্রশাসনের কাছে নেই। বিষয়টি নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’