Breaking News

আধুনিক বিশ্বের দাওয়া ও দায়ী

প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলম:
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যার প্রতিটি বিধান মানবতার কল্যাণে নিবেদিত। ইসলাম কেবল নিছক কিছু ধর্মীয় ইবাদত ও আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়, বরং এটি এমন একটি জীবনদর্শন যা মানুষের আত্মিক, নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আলোকিত পথ নির্দেশ করে। আর এই আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার মূল মাধ্যম হলো দাওয়া (دعوة)। যা সমাজ সংস্কারের প্রধান অস্ত্র।
নবী-রাসূলগণও দাওয়াতের মাধ্যমেই মানবজাতিকে তাওহীদের পথে আহ্বান করেছেন, এবং তাঁদের পুরা জীবন ব্যাবস্থাকে পরিবর্তন করে নতুন ধারায় সাজিয়ে ছেন।
এমনকি উত্তরসূরিগণও এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দাওয়া কেবল ধর্মীয় কর্তব্য নয়, এটি সমাজ ও মানবতার পুনর্জাগরণের চাবিকাঠি।
বর্তমান বিশ্বে নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় উদাসীনতা ও বস্তুবাদী জীবনধারার প্রভাবে দাওয়াতুল ইসলাম বা ইসলামের আহ্বান আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই এই প্রবন্ধে আমরা দাওয়ার সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, শর্ত, রুকন, দায়ীর গুণাবলী, হুকুমগত দিক, পদ্ধতি ও আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োগ বিষয়ে বিশ্লেষণ করব ইনশাআল্লাহ।
দাওয়া শব্দের ভাষাগত ও পরিভাষাগত সংজ্ঞা
** ভাষাগত অর্থ:
“দাওয়া” (دعوة) শব্দটি এসেছে আরবি ভাষা থেকে।  মূল ধাতু دعا – يدعو – دعوة  যার অর্থ “ডাকা, আহ্বান করা, আমন্ত্রণ জানানো”।
অর্থাৎ, কাউকে কোনো বিষয়ে আহ্বান জানানো বা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করাই হলো দাওয়া।
** পরিভাষাগত অর্থ:
ইসলামী পরিভাষায় দাওয়া বলতে বোঝায় “মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা, প্রচলিত জীবন ধারা থেকে ইসলামী জীবনব্যবস্থার দিকে ফিরিয়ে আনা এবং কুরআন-সুন্নাহ অনুসারে জীবন গঠনের আহ্বান করা।”
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন: “দাওয়া হলো মানুষকে তাদের সৃষ্টিকর্তার পথে আহ্বান করা, যেন তারা তাঁর নির্দেশ অনুসারে জীবনযাপন করে।”
আল্লাহ তাআলা বলেন “তুমি তোমার প্রভুর পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে উত্তমভাবে বিতর্ক কর।” (সূরা আন-নাহল আয়াত ১২৫)
কুরআন ও হাদীসে দাওয়ার তাৎপর্য
দাওয়া ইসলামের এমন একটি মৌলিক দায়িত্ব, যা প্রতিটি নবী-রাসূলের মিশনের কেন্দ্রবিন্দু।
কুরআনের নির্দেশ: “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা মানুষকে সৎকাজের দিকে আহ্বান করবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। তারাই সফলকাম।”(সূরা আলে ইমরান আয়াত ১০৪)
আরও বলা হয়েছে, “কে সেই ব্যক্তি, যার কথা তার চেয়ে উত্তম যে আল্লাহর পথে আহ্বান করে, সৎকাজ করে ও বলে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা ফুসসিলাত আয়াত ৩৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটিও আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।” (সহিহ বুখারী) “যে ব্যক্তি সৎ পথে আহ্বান করে, তার জন্য ততটুকু সওয়াব রয়েছে যতজন তার অনুসরণ করে”(সহিহ মুসলিম)
** দাওয়ার প্রকারভেদ:
দাওয়া সাধারণত দুই প্রকারে বিভক্ত করা হয় —
১️ দাওয়াত ইলাল্লাহ (دعوة إلى الله):
অর্থাৎ মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা — তাওহীদ, ঈমান, সালাত, সিয়াম, নৈতিকতা ও আখলাক শেখানো। এটি মূলত ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আহ্বান।
২️ দাওয়াত ইলাল-খাইর (دعوة إلى الخير):
অর্থাৎ মানুষকে কল্যাণ, সৎকর্ম, ন্যায়, মানবতা ও সমাজসেবার দিকে আহ্বান করা।যেমন — শিক্ষার দাওয়া, নৈতিকতা, মানবিক সহায়তা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ইত্যাদি। অনেকে আরও তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন —
১. মুসলিমদের দাওয়া (ঈমান দৃঢ়করণ)
২. অমুসলিমদের দাওয়া (ইসলামে আহ্বান)
৩. নিজের প্রতি দাওয়া (আত্মশুদ্ধি)
** দাওয়ার শর্তসমূহ:
একজন দাঈর দাওয়া গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হতে হলে কিছু শর্ত পূরণ আবশ্যক।নিন্মে দেওয়া হলো
১. সঠিক আকীদা ও ঈমান: আহ্বানকারীর নিজের বিশ্বাস হতে হবে খাঁটি তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত।
২. ইলম বা জ্ঞান: কুরআন, হাদীস ও ইসলামী আদর্শের প্রাথমিক জ্ঞান ছাড়া দাওয়া অসম্পূর্ণ।
৩. হিকমত ও প্রজ্ঞা: পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিকভাবে কথা বলার জ্ঞান থাকা।
৪. খালেস নিয়ত: দাওয়া হতে হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
৫. ধৈর্য ও সহনশীলতা: বিরোধিতা, অবজ্ঞা বা কষ্টের মুখেও ধৈর্যধারণ করতে হবে।
৬. সুন্দর আচরণ: দাঈর চরিত্রই দাওয়ার প্রথম পরিচয়।
৭. দুআ ও তাওয়াক্কুল: ফলাফল আল্লাহর হাতে — তাই নির্ভরতা থাকতে হবে তাঁর উপর।
** দাওয়ার রুকন: (ركن الدعوة)
রুকন শব্দ টি আরবি, অর্থ ভিত্তি, স্তম্ভ, বা খুটি, যার উপর কোন কিছু নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত হয়। দাওয়ার মৌলিক ভিত্তি বা রুকন হলো চারটি:
১️ وَاضِعُ الدَّعْوَةِ দাওয়া প্রবর্তনকারী আল্লাহ তাআলাই দাওয়ার বিধান দিয়েছেন এবং মানুষকে তাঁর পথে আহ্বান করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
২️ الدَّاعِي আহ্বানকারী যিনি দাওয়া করেন — নবী, আলেম, শিক্ষক বা সচেতন মুসলমান।
৩️ الْمَدْعُو আহ্বানপ্রাপ্ত যাকে দাওয়া করা হচ্ছে — মুসলিম, অমুসলিম, বন্ধু, পরিবার ইত্যাদি।
৪️ الْمَدْعُو إِلَيْهِ আহ্বানের বিষয় তাওহীদ, ঈমান, ইবাদত ও ইসলামী জীবনব্যবস্থা।
এই চার রুকন ছাড়া দাওয়া পূর্ণ হয় না।
** দাওয়ার হুকুমগত দিক :  (الأحكام الشرعية للدعوة)
দাওয়া ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত এবং এর হুকুম দুটি ভাগে বিভক্ত:
১️ ফরজে আইন (فرض عين):
প্রত্যেক মুসলমানের জন্য নিজ পরিবার, সন্তান, ছাত্র বা অধীনস্থদের আল্লাহর পথে আহ্বান করা ব্যক্তিগত দায়িত্ব।
“তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা কর।” — (সূরা আত-তাহরীম ৬)
২️ ফরজে কিফায়া (فرض كفاية):
সমাজে যদি একটি দল দাওয়ার কাজ করে, তবে বাকিদের থেকে দায়িত্ব উঠে যায়। কিন্তু কেউ না করলে সবাই গুনাহগার হবে।
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা মানুষকে সৎকাজের দিকে আহ্বান করবে…” — (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১০৪। দাওয়া ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের ওপর দায়িত্ব। নিজের ক্ষমতা ও অবস্থান অনুযায়ী সবাইকে অংশ নিতে হবে।
** দায়ীর গুণাবলী : (صفات الداعية)
একজন সফল দাঈ হতে হলে তার মাঝে নিম্নলিখিত গুণাবলী থাকা অপরিহার্য:
১. খালেস নিয়ত ও আল্লাহভীতি
২. সহিহ আকীদা ও গভীর জ্ঞান
৩. হিকমত বা প্রজ্ঞা
৪. ধৈর্য, সাহস ও দৃঢ়তা
৫. সুন্দর চরিত্র ও আচরণ
৬. বিনয় ও নম্রতা
৭. মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দয়া
৮. আচরণে দাওয়ার প্রতিফলন (role model হওয়া)
৯. বাকপটুতা ও যুক্তিনির্ভরতা
১০. দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মনোভাব
দাওয়ার পদ্ধতি
কুরআনে দাওয়ার পদ্ধতি তিনটি প্রধান রূপে নির্ধারিত হয়েছে:
“তুমি তোমার প্রভুর পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ এবং সুন্দর বিতর্কের মাধ্যমে।” — (সূরা আন-নাহল, আয়াত ১২৫)
১️ হিকমত (প্রজ্ঞা):
যথাস্থানে উপযুক্ত ভাষা ও যুক্তি প্রয়োগ করে দাওয়া করা।
২️ মাওইযাতুল হাসানা (উত্তম উপদেশ):
মানুষের হৃদয়ে নরমভাবে প্রভাব ফেলার মতো ভাষা ও উদাহরণ ব্যবহার করা।
৩️ জিদাল বিল্লাতি হিয়া আহসান (সুন্দর বিতর্ক):
সম্মানজনক ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে সত্য তুলে ধরা।
নবী-রাসূলদের দাওয়া মডেল
নবীগণ ছিলেন সর্বোত্তম দাঈ।
নূহ (আঃ) ৯৫০ বছর ধৈর্য সহকারে দাওয়া করেছেন।
ইব্রাহীম (আঃ) যুক্তি ও প্রজ্ঞায় মূর্তিপূজকদের সাথে তর্ক করেছেন।
মূসা (আঃ) ফেরাউনের মতো শাসকের কাছেও কোমল ভাষায় আহ্বান করেছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কা ও মাদীনায় দাওয়ার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করেছেন।
“তুমি তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করেছিলে; যদি কঠোর হতে তাহলে তারা তোমার চারপাশ থেকে সরে যেত।” — (সূরা আলে ইমরান আয়াত ১৫৯)
আধুনিক প্রেক্ষাপটে দাওয়ার প্রয়োজনীয়তা
বর্তমান যুগে দাওয়ার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে কারণ—
ধর্মীয় উদাসীনতা ও নাস্তিক্যবাদের প্রসার
সামাজিক অবক্ষয়, অশ্লীলতা ও নৈতিক দুর্বলতা
মুসলিম সমাজে বিভেদ ও মতপার্থক্য
গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব
তাই আজকের দাওয়া হতে হবে যুক্তিসঙ্গত, আধুনিক জ্ঞানসমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর।
** বর্তমান যুগে দাওয়ার উপযুক্ত পদ্ধতি:
১. ডিজিটাল দাওয়া: সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, ওয়েবসাইট ও পডকাস্টের মাধ্যমে দাওয়া প্রচার।
২. শিক্ষা ও মানবসেবা: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন—এসবের মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধ ছড়ানো।
৩. আচরণের দাওয়া: দাঈর জীবন যেন দাওয়ার বাস্তব উদাহরণ হয়।
৪. যুবসমাজের ভাষায় দাওয়া: যৌক্তিক ও বাস্তবভিত্তিক ভাষা ব্যবহার।
৫. সহনশীলতা ও সংলাপ: বিতর্ক নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে সত্য প্রচার।
** দাওয়ার চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা :
১. ইসলামভীতির প্রচারণা ও মিডিয়ার বিকৃতি
২. মুসলিম সমাজে জ্ঞানহীনতা ও দাঈদের মধ্যে ভেদাভেদ
৩. প্রযুক্তির অপব্যবহার
** আধুনিকতা ও ধর্মীয়তার দ্বন্দ্বের সমাধান :
১. দাঈদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণাভিত্তিক দাওয়া কর্মসূচি
২. কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা বিস্তার
৩. ইসলামী গণমাধ্যম ও সাহিত্যচর্চা বৃদ্ধি
৪. তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিনির্ভর দাওয়ায় সম্পৃক্ত করা
৫. দাঈদের জন্য নৈতিকতা, শুদ্ধ উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গির মার্জিত হওয়া।
দাওয়া ইসলামের প্রাণ। নবী-রাসূলদের মিশন দাওয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয়েছে। আজকের সমাজে সত্যিকার পরিবর্তনের একমাত্র পথ হলো জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সুন্দর আচরণের দাওয়া। প্রতিটি মুসলমান তার অবস্থান থেকে দাওয়াতুল ইসলাম-এর বাহক হতে পারে।
> “যে ব্যক্তি একজন মানুষকে হিদায়াতের পথে আনবে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে জীবন দান করল।” — (সূরা মায়িদাহ ৩২)
সুতরাং, জ্ঞান, ধৈর্য ও চরিত্রবান ব্যক্তিদের দাওয়া-ই-ইসলামকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিয়েছে। আর এভাবেই সমাজের সকল কুসংস্কার দূর করে ইসলামের আলোই আলোকিত করে দেওয়া আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।

লেখক: প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক – কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী। মোবা: ০১৯১১৬০৪৪৫৫

রেফারেন্স / তথ্য সূত্র :
1. আল-কুরআনুল কারিম
2. সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম
3. ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যা, আল-ফাওয়াইদ
4. ইমাম গাজ্জালী, ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন
5. সাইয়্যিদ কুতুব, ফি যিলালিল কুরআন
6. ইউসুফ আল-কারজাবি, ফিকহুদ দাওয়া
7. আবুল হাসান আল-নাদভী, দাওয়া ও তাবলীগের গুরুত্ব
8. দাওয়াতুল ইসলাম বিষয়ক সংকলন ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ,

About admin

Check Also

ভারতীয় দালালদের জুতা পেটা করে বাংলাদেশ ছাড়া করতে হবেঃ আক্তারুজ্জামান

  মোঃ আক্তরুজ্জামান,খুলনা: বাংলাদেশীরা এমন যাতি যারা কখনো হার মানেনা,। বাংলাদেশে  স্বাধীন হওয়ার পর যখন …