বিশেষ প্রতিনিধি:আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দলীয় নেতারা।
এরপরই সামনে আসছে আরও কিছু শব্দ। সংসদে প্রচলিত কিছু শব্দ রয়েছে,যেমন-কোরাম, এক্সপাঞ্জ, পয়েন্ট অব অর্ডার ইত্যাদি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ১৮ মাস পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন।
১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত ২৯৬ জন সদস্য শপথ গ্রহণ করেছেন।
তাদের মধ্যে ২২৭ জন প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন।
অর্থাৎ প্রায় ৭৬ শতাংশ সদস্যের সংসদীয় কার্য প্রণালী সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই।
এছাড়াও এবারের সংসদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সরকার দল, বিরোধী দলসহ নির্বাচনে জয়ী প্রায় সব রাজনৈতিক দলীয় প্রধানরাই এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
ফলে বিশ্লেষকদের মতে, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি, আইন প্রণয়নের জটিল প্রক্রিয়া,স্থায়ী কমিটির কার্য ক্রম এবং সংসদীয় রীতি নীতি সম্পর্কে তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। বুঝতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
এছাড়া যারা ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন তাদের অনেকের মধ্যেও সংসদের কাজ কীভাবে চলে তা নিয়ে কৌতু হল আছে।
এই বাস্তবতায় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ টার্ম বা পরিভাষা গুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ রয়েছে।
সংসদে কীভাবে আইন প্রণয়ন হয়, কীভাবে বিতর্ক পরিচালিত হয় কিংবা সংসদের ভেতরে কোনো সংকট তৈরি হলে কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, এসব বোঝার জন্য প্রচলিত টার্ম গুলো জানা গুরুত্ব পূর্ণ।
বহুল ব্যবহৃত কিছু পরিভাষার ব্যাখ্যা তাই পাঠ কদের জন্য তুলে ধরা হলো:
## ওয়াক আউট কি?
সংসদে কোনো বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে বিরোধী দল বা কোনো সদস্য ইচ্ছাকৃতভাবে সভা কক্ষ ত্যাগ করলে তাকে ওয়াক আউট বলা হয়।
বাংলাদেশের সংসদে বিরোধী দল বিভিন্ন সময়ে সরকা রের কোনো কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেছে।
## কোরাম কি? : সংসদের কোনো বৈঠক বৈধভাবে পরিচাল নার জন্য যে ন্যূনতম সংখ্যক সদস্য উপস্থিত থাকতে হয় তাকে কোরাম বলা হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের রুলস অফ প্রসিডিওর অনুযায়ী মোট ৬০ জন সদস্য উপস্থিত থাকলেই কো রাম পূর্ণ হয়।
যদি সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য উপস্থিত না থাকেন,তবে সভা স্থগিত করা হয়।
## কোরাম ক্রাইসিস:
সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য উপস্থিত না থাকায় কোরাম পূর্ণ হয় না এবং সংসদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়, তখন তাকে কোরাম ক্রাইসিস বলা হয়।
বাংলাদেশের সংসদে একাধিকবার দেখা গেছে যে সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে কোরাম সংকট দেখা দিয়েছে এবং অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য স্থগিত করতে হয়েছে।
টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন পার্লামেন্ট ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী,একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বছরে পাঁচ অধিবেশনে কোরাম সংকটে যে সময় ব্যয় হয়ে ছে, তার অর্থমূল্য ২২ কোটি টাকার বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম পাঁচটি অধিবেশনে মোট কার্যদিবস ছিল ৬১টি।
প্রতিদিন গড়ে ১৯ মিনিট ছিল কোরাম সংকট। মোট কোরাম সংকট ছিল ১৯ ঘণ্টা ২৬মিনিট।
কোরাম সংকটের এই সময়ের আর্থিক মূল্য ২২ কোটি ২৮ লাখ ৬৩ হাজার ৬২৭টাকা।
কোনো কোনো সময় বিরোধী দল সংসদ বর্জন কর লেও কোরাম সংকট দেখা দিতে পারে।
## বিল: সংসদে নতুন আইন প্রণয়নের অথবা আইন সংশো ধনের প্রস্তাবকে বিল বলা হয়।
বিল সংসদে উত্থাপন,আলোচনা, সংশোধন এবং ভো টের মাধ্যমে পাস হওয়ার পরই তা আইনে পরিণত হয়।
সংসদীয় ব্যবস্থায় সাধারণত দুই ধরনের বিল দেখা যায়। সরকারি বিল এবং বেসরকারি বিল।
সংসদে মন্ত্রীরা যে বিলগুলো উত্থাপন করেন সেগুলো কে বলা হয় সরকারি বিল।
অন্যদিকে মন্ত্রী ছাড়া বাকি সব সংসদ সদস্য যদি কো নো বিল উত্থাপন করেন, সেগুলোকে বলা হয় বেসর কারি বিল।
সংসদীয় রীতি অনুযায়ী বেসরকারি সদস্য দের বিল উত্থাপনের জন্য সংসদের কার্যসূ চিতে সপ্তাহে একটি দিন বরাদ্দ থাকে।
ওইদিন কোনো সংসদ সদস্য আইন প্রণয় নের প্রস্তাব দেন,সেটিই বেসরকারি বিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বেসরকারি বিল পাস হওয়ার ঘটনা খুবই সীমিত।
মি.মহিউদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নবম জাতীয় সংসদে তিনটি বেসরকারি বিল পাস হয়েছিল।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে মোট ছয়টি বিল পাস হয়ে ছিল।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মোট নয়টি বেসরকারি বিল আইন হিসেবে পাস হয়ে ছে।
অর্থাৎ, সংসদে পাস হওয়া অধিকাংশ বিলই সরকারি বিল।
এসব বিল সাধারণত সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া আকারে প্রস্তুত করা হয়।
পরে মন্ত্রিসভার বৈঠ কে সেই বিলের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সংসদে বিল টি উত্থাপন করেন এবং এরপর শুরু হয় আইন প্রণয় নের সংসদীয় প্রক্রিয়া।
## পয়েন্ট অব অর্ডার কি: সংসদের কার্যক্রম চলাকালে কোনো সদস্য যদি মনে করেন যে কার্য প্রণালী বিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে,সংসদে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় কোনো সদস্য মনে করেন উত্থাপিত বক্তব্যের বিষয়ে তার আপত্তি,ব্যাখ্যা বা মন্তব্য করার প্রয়োজন রয়েছে,তখন তিনি পয়েন্ট অব অর্ডার’ উত্থাপন করতে পারেন।
এর মাধ্যমে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় এবং স্পিকার বিষয়টি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেন।
সংসদীয় আলোচনায় বিতর্ককে প্রাসঙ্গিক রাখার ক্ষেত্রে পয়েন্ট অব অর্ডার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া হিসে বে ব্যবহৃত হয়।
## ফ্লোর:সংসদের মূল বিতর্কের জায়গাকে ফ্লোর বলা হয়। সংসদ সদস্যরা যখন বক্তৃতা দেন বা মতামত প্রকাশ করেন তখন বলা হয় তারা “ফ্লোরে বক্তব্য রাখছেন”।
##ফ্লোর ক্রসিং:কোনো সদস্য যদি নিজের দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে বিপরীত পক্ষের প্রস্তাব বা সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দেন, তখন সেটিকে ফ্লোর ক্রসিং বলা হয়।
বিশ্বের অনেক দেশেই এ বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। মি. মহিউদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,প্রায় ৪১টি দেশে ফ্লোর ক্রসিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে সব দেশেও এই নিয়ম এক রকম নয়।
মি মহিউদ্দিনের মতে,কোথাও নিয়মটি খুব ‘রিজিড’, আবার কোথাও কিছুটা ‘ফ্লেক্সিবল’।”
রিজিড ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যরা কোনো অবস্থাতেই নিজ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন না।
অন্যদিকে কিছু দেশে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে দলের বাই রে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকে।
উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের কথা উল্লেখ করা যায়, সেখানে হাউসের নেতা নির্বাচনে, আস্থা বা অনাস্থা ভো টের সময়, এবং অর্থ বিলের ক্ষেত্রে দলের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়া সম্ভব নয়। বাকি কিছু বিষয়ে ছাড় আছে।
বাংলাদেশে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে কঠো র বিধান রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘অ্যান্টি-ডিফেকশন ল’।
এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য সংসদে উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব বা বিলে নিজের দলের সিদ্ধা ন্তের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন না।
তাহলে সেটি ফ্লোর ক্রসিং হিসেবে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনু চ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ার বি ধান রয়েছে।
আবার কেউ যদি যে দলের মনোনয়নে সংসদে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন,সেই দল ত্যাগ করেন বা দল থেকে বহিষ্কার হন তখনও সংবিধানের ৭০অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে।
তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন
সংসদে সদস্যরা সরকারের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। যে প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে সংসদে দাঁড়িয়ে মৌখিকভাবে দিতে হয় তাকে তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন বলা হয়।
## এক্সপাঞ্জ:
সংসদে যত আলোচনা হয়, যত কথা হয় সবই রেকর্ডেড থাকে।
কিন্তু কেউ যদি এমন কোন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করেন যা অশালীন, আপত্তিকর, অসাংবিধানিক, মানহানিকর বা অসংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে তা মুছে ফেলার প্রক্রিয়া কে এক্সপাঞ্জ বলা হয়।
স্পিকার যদি মনে করেন কোনো মন্তব্য সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছে, তবে তিনি তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।
এর ফলে ওই বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ডভুক্ত হয় না। তাই গণমাধ্যমে সেই বক্তব্যকে কোন রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। তবে এমনভাবে লেখা যায় যে “সং সদ অধিবেশনে ‘এই বিষয়টি’ এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে”।
## ট্রেজারি বেঞ্চ কাদের নিয়ে হয় :
সংসদের যে আসনগুলোতে সরকার দলের সদস্যরা বসেন সেগুলোকে ট্রেজারি বেঞ্চ বলা হয়। সাধারণত প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীরা এই বেঞ্চে বসেন।
সংসদে স্পিকারের আসনের ডানদিকে সামনের সারিতে অবস্থিত আসনগুলোই ‘ট্রেজারি বেঞ্চ।
সংসদীয় রীতি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে বিদায়ী স্পিকার সভাপতিত্ব করেন। তার অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার সভা পরিচালনা করেন।
প্রথা অনুযায়ী কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে বৈঠক শুরু হয়। এরপর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয় এবং বিদায়ী স্পিকারের স্বাগত ভাষণ দেওয়া হয়।
তবে এবারের সংসদে এই প্রক্রিয়ায় কিছু ব্যতিক্রম ঘটবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি মো.সাহাবুদ্দিন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন।
সে সময় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আত্ম গোপ নে ছিলেন এবং পরে সেপ্টেম্বর মাসে পদত্যাগ করেন।
এর ফলে এবারের সংসদের প্রথম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মনোনীত কোনো ব্যক্তি সভাপতিত্ব করবেন বলে জানিয়েছেন সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি
Bartabd24.com সব খবর সবার আগে