ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
পশ্চিমা শীতল বাতাশ ধেয়ে আসছে শৈত্য প্রবাহ, প্রয়ো জন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেনা।
শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষ কাজের সন্ধানে বাইরে যাওয়া ছাড়া ইচ্ছে করে কেউ ঘুরতেও বের হয়না। এই শীতল আবহাওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের পাশাপাশি খাবার সংকটে পড়েছে এই বিরল প্রজাতির হনুমান গুলো। মুখে শুধু আয়’ বলা মাত্রই ছুটে আসে শত শত কালোমুখো হনুমান।
এমনই এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যায় ঝিনাইদহের মহেশ পুর উপজেলার ভবনগর গ্রামে। গ্রামজুড়ে চোখে পড়ে বিরল প্রজাতির এই কালোমূখো হনুমানের অবাধ বিচর ণÑকেউ গাছে,কেউ বাড়ির ছাদে,কেউ আবার মানুষের পাশে বসে নির্ভারতার সাথে সময় কাটাচ্ছে।
একসময় এলাকায় প্রচুর ফলদ ও বনজ গাছ থাকায় খাবারের অভাব ছিল না এই বন্যপ্রাণীর।
কিন্তু গাছপালা কমে যাওয়া,বাগান উজাড় হওয়া ও মানব কর্মকা- বৃদ্ধির ফলে এখন খাবার সংকটে পড়েছে তারা। ফলে কখনো ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে,আবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে অনেক হনুমান।
স্থানীয় যুবক নাজমুল হোসেন নিজ উদ্যোগে প্রতিদিন সরকারি বরাদ্দকৃত খাবার তাদের সামনে পৌঁছে দেন। তবে তিনি জানান,বরাদ্দকৃত খাবার অত্যন্ত অপ্রতুল-এতে একবেলাও ঠিকভাবে খাওয়ানো যায় না শতাধিক হনু মানকে।
নাজমুল হোসেন বলেন,‘আমি ডাক দিলেই এভাবে ছুটে আসে শত শত হুনমান।
ওরা এখন আমাদের পরিবারের কাছের লোকের মতোই। কিন্তু খাবারের সংকটে ওরা কষ্ট পাচ্ছে-এটাই সবচেয়ে কষ্টের।’
গরমের মৌসুমে প্রতিদিনই নানা জেলা থেকে আসে দর্শনা র্থীরা। শিশু থেকে বড়-সবাই মুগ্ধ হনুমানদের কাছাকাছি দেখতে পেয়ে।
তারা নিজ হাতে খাবার তুলেদেন তাদের কাছে। তবে খাবারের অভাব আর অরক্ষিত পরিবেশের কারণে কখনো কখনো হনুমান আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
দর্শনার্থী বসির আহমেদ বলেন,‘এত কাছ থেকে এতগুলো হনুমান দেখা এক অন্যরকম অনুভূতি।’
স্থানীয় বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন,‘সরকারি উদ্যোগ আরও বাড়ানো দরকার।
তা না হলে একসময় হয়তো আর পাওয়া যাবে না এসব হনুমানদের।’
এবিষয়ে প্রাণ পরিবেশ প্রতিবেশ সংগঠক সুজন বিপ্লব বলেন,কালোমুখো হনুমান রক্ষায় তাদের প্রাকৃতিক আবা সস্থল সংরক্ষণ,পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ,শিকারি প্রাণীর হাত থেকে সুরক্ষা এবং স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি
করা প্রয়োজন।
সরকার ও বন বিভাগকে তাদের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণা এবং খাবারের বরাদ্দ বাড়াতে হবে,যাতে তারা খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে না আসে এবং মানুষের সাথে সংঘাত এড়ানো যায়। যেসব অঞ্চলে কালোমুখো হনুমানের বিচ রণ বেশি, সেগুলোকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা। তাদের বিচরণক্ষেত্র বা বনভূমি ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকা।
আইনগত সুরক্ষায় বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় মানুষদের মধ্যে হনুমান সংরক্ষণ ও তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। পশু চিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে তাদের নিয়মিত দেখভালের ব্যবস্থা করতে হবে। ফসল বা অন্যান্য ক্ষতি হলে হনুমান কেমেরে ফেলা বা আঘাত করা থেকে বিরত থাকার জন্য প্রচার চালানো। নিরাপদ আবাসস্থলে গড়ে তুলতে বনায়ন তৈরি করতে হবে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় হনুমান নিধন বন্ধে আইনানুগ কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঝিনাইদহ জেলা ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন,‘নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রতিদিন বন বিভাগের পক্ষ থেকে বাদাম,কলা ও সবজী খেতে দেওয়া হয়,তবে তা পর্যাপ্ত নয়।
হনুমানগুলো শুধু মহেশপুর উপজেলার ভবনগর গ্রামেই
থাকে। জেলার অন্য কোন উপজেলায় তাদের অবস্থান নেই।
মাঝে মধ্যে খাবারের অভাবে এদিক সেদিক ছুটে যায়। তবে এ জেলায় সামাজিক বনায়ন ছাড়া কোন বন নেই।
১০ বছর আগে সামাজিক বনায়নের পরিমাণ ছিল শত করা ১৪.২ একর। তবে বর্তমানে তা অনেক কমে গেছে।
বনায়নের সঠিক কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। কেউ
হনুমান শিকার করলে বা ক্ষতির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন,জেলায় বন না থাকায় হনুমানের অভয়ারণ্য ঘোষণা করার কোন সুযোগ নেই।’
তবে বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। বন বিভাগের হিসাবে বর্তমানে ভবনগর গ্রামে রয়েছে দুই শতাধিক কালোমুখো হনুমান। অথচ একসময় ছিল দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংস,খাবার সংকট আর মানবসৃষ্ট বৈরী পরিবেশে প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত কমছে।
পরিবেশবিদদের মতে,এভাবে চলতে থাকলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে এই বিরল প্রজাতির হনুমান,ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই অঞ্চলের জীববৈচিত্রও। তাই সবার আগে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত সংরক্ষণ উদ্যোগ,খাবারের স্থায়ী ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা।
Bartabd24.com সব খবর সবার আগে