Breaking News

প্রতিবন্ধীদের জীবনের গল্পটা অনেক কঠিন ও কষ্টের

শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া খুলনা:
# প্রতিবন্ধীদের তৈরী হস্তশিল্প এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে
# নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু ক্যাটাগরীতে শ্রেষ্ঠ জয়তি পদক পেয়েছেন দুজন।

ডিসি, ইউওনো, চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে পাচ্ছেন সম্মান  সমাজে বিভিন্ন কাজে অবদান রাখছে ১৭৭৫ জন প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী খুলনা (২৬ জানুয়ারি) যশোরের শিমুৃলিয়া ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামের প্রতিবন্ধী টফি খাতুন (৩০)। জন্মের এক বছর পর পোলিও টিকা দেওয়া র পর সাইড ইফেক্টে একটি পা পঙ্গু হয়ে যায়।

জীবনে চলার পথে অনেক আঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে তিনি এখন অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তার হাতে তৈরী হস্তশিল্প এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।

নির্যাতনের বিভিষিকা নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু ক্যাটা গরীতে শ্রেষ্ঠ জয়তি পদক পেয়েছেন বাগেরহাটের মোংলা র চাঁদপাই এলাকার রিখা কর্মকার এবং চুয়াডাঙ্গা দামুড় হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা এলাকার শাহানারা বেগম।
শুদু তারাই নন, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও বাগেরহাট জেলার তিন উপজেলার ১ হাজার ৭৭৫ জন প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী সমাজে বিভিন্ন কাজে অবদান রাখছে।

নিজেদেরকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলায় এসব মানুষদের আর সরকারী-বেসরকারী অফিসগুলোতে কোন কাজে গেলে অন্যের সহযোগিতা নিতে হয় না।

বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিধভা ভাতার কাজগুলো এখন নিজেরাই করতে পারেন এবং অন্যদেরকেও সহযো গিতা করেন।

আজ থেকে আরো দশ বছর আগেও এসব প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীরা ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলার সরকারী অফিসগুলো চিনতো না।

এখন তারা ইউনয়ন পরিষদে গেলে চেয়ারম্যান একটি চেয়ার এগিয়ে দেয়, ইউওনো পাশে বসায়, জেলা প্রশাস কের অনুষ্ঠানগুলোতে বক্তব্য রাখার সুযোগ পান তারা। সমাজসেবা অফিসে গিয়ে নিজেদের কাজসহ অন্যদের কাজও করাতে পারেন কোন ঝামেলা ছাড়াই।

এসব প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন ও উন্নত করার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বেসরকারী সংস্থা ‘কারিতাস বাংলাদেশ’। তবে তাদের দক্ষ হয়ে ওঠার পেছনে প্রতিটি মানুষের জীবনের করুণ গল্প রয়েছে।

গত দুদিন সরেজমিনে এসব এলাকা ঘুরে এসব তথ্য পাও য়া গেছে। কারিতাস বাংলাদেশ খুলনা অঞ্চলে ঝউউই- প্রকল্পটি ৩টি ইউনিয়নে কাজ করে।

এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ১. স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতি সাধনে লক্ষিত জনগোষ্ঠী তথা প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষতা, সক্ষমতা এবং মানব সম্পদের উন্নয়ন করা। ২. তাদের অধিকার আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং সমাজে তাদের পূর্ণ মাত্রায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সেই সাথে সর্বস্তরে তাদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা।
জানতে চাইলে কারিতাস বাংলাদেশ খুলনা অঞ্চলের রিজিনাল মানিটর (এসডাব্লিউভিসি) স্নিগ্ধা মৌ ঘোষ বলেন, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জীবন মান উন্নয়নে ২০০৫ সাল থেকে কাজ শুরু করে। প্রকল্পটির লক্ষিত জনগোষ্ঠী হলো প্রবীণ

এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রকল্প শুরুর প্রথম দিকে প্রকল্পটি চ্যারিটি বেজ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতেন। যেমন, বিভিন্ন ধরনের আইজিএ সাপোর্ট, চিকিৎসা সহায় তা, আর্থিক অনুদান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সাহায়ক উপকরণ, করোনা মহামারীকালীন আর্থিক সহায়তা ও সেনিটাই।জেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত সহ অন্যান্য অনুদান দিয়ে সহযো গিতা করেছে।

তিনি বলেন, এরপর আমরা চিন্তা করি যে-কারিতাস তো একসময় থাকবে না। তাহলে এসব মানুষের কি হবে। এটি চিন্তা করে তাদের দক্ষতা অজর্ন ও উন্নত জীবনযাপনের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ফলে খুলনা অঞ্চলে এসডিডিবি-প্রকল্প চুয়াডাঙ্গা দামুড় হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন, যশোরের ঝিক রগাছা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়ন ও বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নে প্রবীণ ও প্রতিব ন্ধীদের নিয়ে কাজ শুরু করেন ২০১৬ সালে।এ প্রকল্পের আওতায় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ভাতা প্রাপ্তিতে প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধীদের সরাসরি লিং কেজ করা হয়। তাদেরকে নিয়ে সরকারী-বেসরকারী অফিসগুলোতে পরিচিতি করা এবং আবেদনসহ বিভিন্ন কাজ কিভাবে করতে হয় তা শেখানো হয়। ফলে তারা এখন আমাদের থেকেও অনেক বেশী দক্ষ হয়ে উঠেছে।

জানতে চাইলে কারিতাস বাংলাদেশ খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক আলবিনো নাথ বলেন, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সামাজিক ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার। তাদের কণ্ঠস্বর, অধিকার ও সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা নিলেই গড়ে উঠবে একটি সম্মানজনক ও টেকসই সমা জ।

বোঝা নয় বরং অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাবনার সম্ভার হিসেবে বিবেচনা করে তাদের সম্মান, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করতে সরকার, এনজিও ও সমাজকে একসাথে এগিয়ে আসার মাধ্যমে সচেতন পদক্ষেপই আগামী দিনে তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্রকল্পটি চ্যারিটেবল কাজের পরি বর্তে উপকার ভোগীদের জন্য রাইট বেস কার্যক্রম বাস্ত বায়ন করছে। বর্তমানে ৩টি ইউনিয়নে প্রকল্পের সহযো গিতায় ২৪ টি ওয়ার্ডে ২৪ টি ক্লাব এবং ৩টি প্রতিবন্ধী নারী ফোরাম গঠন করা হয়েছে।

২৪ টি ক্লাবের সমন্বয়ে প্রতিটি ইউনিয়নে ১টি করে নারী ফোরাম গঠন করা হয়েছে। এই ৩টি নারী ফোরাম থেকে ইতিমধ্যে ১টি ফোরাম সরকার থেকে নিবন্ধন্দতি হয়েছে।

আলবিনো নাথ বলেন, নারী প্রতিবন্ধী ফোরাম থেকে ৩ জন নারী তাদের দক্ষতা ও আর্থক স্বনির্ভরতার উপজেলা ও জেলা পর্যায় থেকে জয়িতা এ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। ৩টি ইউনিয়নের ক্লাবগুলি নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ইতিমধ্যে সংগঠন ৩টির নামের ছাড়পত্র হয়েছে। ৩টি ইউ নিয়নের ক্লাব সদস্যরা মনে করেন সংস্থা ৩টি নিবন্ধন পেলে কাজের পরিধি আরো বৃদ্ধি পাবে।

প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আরও বেশি বেশি সরকা রের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা তারা পাবেন।

কারিতাস এনজিও পিছন থেকে যে সহযোগিতা করছে সেই সহযোগিতা বন্ধ হয়ে গেলেও তারা নিজেরা কার্যক্রম ধরে রাখতে পারবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখাগেছে- কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নে এসডিডিবি- প্রকল্পের মোট উপকার ভোগী প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী সদস্য ৬৫৬ জন।

তার মধ্যে প্রবীণ সদস্য ৪২৫ জন। প্রতিবন্ধী সদস্য ২৩১ জন। শিমুলিয়া ইউনিয়নে ৫২১ জন । যার মধ্যে প্রবীণ সদস্য ৩৬০ জন ও প্রতিবন্ধী সদস্য ১৪৬ জন।

চাঁদপাই ইউনিয়নে ৫৯৮ জন, যার মধ্যে প্রবীণ সদস্য ৪০০ জন ও প্রতিবন্ধী সদস্য ১৮৮ জন।

প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যেমন বয়স্ক ভাতা,প্রতিবন্ধী ভাতা, সুবর্ণ নাগরিক কার্ড, লোন সেবা সহ অন্যান্য সেবার আওতায় এসেছে ৮০% বাকি সদস্যরা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভি ন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ যেমন : দর্জি প্রশিক্ষণ, হাঁস মুরগি পালন, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলা হয়েছে।

এ্যাডভোকেসি, লবিং এবং নেটওয়ার্কিং প্রশিক্ষণের মাধ্য মে প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ের সচেতন করে তোলা হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে তাদেরকে পরিচিতি বৃদ্ধি করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্লাব সদস্যের এখন নিজেরাই সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে তাদের অধিকার আদায় করতে পারে।

এছাড়া সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তাদের পরিচিতি, সম্পর্ক স্থাপন এবং গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এক ক্লাবের সা থে অন্য ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে একটা আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক অভাবনীয় পরিবর্তন হয়েছে।

প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবারকে কাউন্সেলিং দেওয়ার ফলে পরিবারের সদস্যরা প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি যত্নশীল হয়েছে এবং বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

ক্লাব সদস্যরা এ কার্যক্রমকে করার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্প গ্রহণ করেছে যেমন ক্লাবে সঞ্চয়ী তহবিল গঠন। তহবিলে থেকে অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান,প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা সহায়তা প্রদান, ছাগল পালনের উপর সহযোগিতা ইত্যাদি।

কারিতাসের উপকার ভোগী শিমুলিয়া গ্রামের প্রতিবন্ধী টফি খাতুন বলেন, জন্মের পর পঙ্গু হওয়ায় সংসারের বো ঝা ছিলাম। কিন্তু কারিতাসের সহযোগীতার ফলে এখন সংসারে অভাব নেই।

খেজুরের পাতা ও খড় রোদে শুকি য়ে হাতে বোনা বিভিন্ন ডিজাইনের পাত্র তৈরী করি। একটি পণ্য ৬০ টাকায় বিক্রি করলে ভালোই লাভ থাকে। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানী হয়। শুধু আমি একা নই, শিমুলিয়া গ্রামের সকল প্রতিব্ধী রা এ কাজে জড়িত।

মোংলার চাঁদপাই এলাকার প্রতিবন্ধী রিখা কর্মকার জী বনযুদ্ধের করুণ কাহিনী তুলে ধরে বলেন, এখন আর অভাব নেই। কারিতাসের সহযোগীতায় পাট বুনে বিভিন্ন ডিজাইনের টেবিল ম্যাট তৈরী করি।

ছোট-বড় এসব ম্যাট ৬০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করি। জীবনযদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো রিখা ২০২৫ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার পেয়েছেন।
২০২৩ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ট জয়িতা পুরস্কার পাওয়া চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা এলাকার শাহানারা বেগম চার বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী হন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তিনি পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে ওঠেন। তখন তার পাশে দাড়ায় কারিতাস বাংলাদেশ।

তিনি জানান, দারিদ্রতা ঘোচাতে তিনি দর্জির কাজ শিখে নিজেই পোশাক তৈরীর ট্রেনিং সেন্টার খোলেন। এখন সেখানে এলাকার দারিদ্র কিশোর যুবাদের প্রশিক্ষণ দেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তার এখন সুখের সংসার।

এছাড়া, আহসান হাবীব, সুদীন সরকার, সঞ্চয়ী মন্ডল, কেতাব আলী, আনসার আলী, প্রবীণ নুহ নবী, সবিতা মন্ড ল, আলেয়া খাতুন, আক্তারুজ্জামান, রবিউল ইসলাম, ইন্দ্রজিৎ বিশ^াস, আজিজুল, লাবণী বেগমসহ উপকার ভোগীরা কেউ মাছের পোনা ধরে, কেউ মুদি, সেলুন, কৃষি কাজ, দর্জি, কসমেটিক্স, গ্রাম্য চিকিৎসা করে জীবন নির্বা হ করছেন।

এসব প্রবীন ও প্রতিবন্ধীদের জীবনের গল্পটা অনেক কঠিন ও কষ্টের। তবে এখন তারা আর সমাজ বা পরি বারের বোঝা নয়।

তারা এখন অনেক শিক্ষিতদের চাইতে ভালো বোঝেন, ভালো জানেন। প্রতিবন্ধী ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধাব ভাতা ইত্যাদি কাজে সকলকে সহযোগিতা করতে পারেন। সক ল শ্রেণীর মানুষদের কাছে মূল্যায়িত হন, সম্মান পান। তারা নিজেদেরকে আর অসহায় ভাবেন না।

 

About admin

Check Also

শার্শার উলাশী ইউনিয়ন বিএনপির আয়োজনে নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত   

(শার্শা) উপজেলা প্রতিনিধিঃ আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে যশোরের শা র্শার উলাশী ইউনিয়ন বিএনপির আয়োজনে …