রাশেদুল ইসলাম: ব্যতিক্রম একটি স্কুলের শান্তি উৎসবে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় । বলা হয়েছে, এ স্কুলে মানুষ হবার শিক্ষা দেওয়া হয় । প্রশ্ন হতে পারে, শিক্ষার্থীরা মানুষ হওয়ার শিক্ষা পেলে কি লাভ ?
স্কুলের নামের মধ্যেই এ প্রশ্নের উত্তর রয়ে গেছে । স্কুলের নাম পীস স্কুল বা শান্তির স্কুল।
তারমানে এই স্কুলে পড়লে শিক্ষার্থীরা মনে শান্তি পাবে। তাঁরা যখন বড় হবে, তখন তাঁদের পরিবার ও সমাজ শান্তি পাবে ।
একথার সারমর্ম এইযে, মানুষ মানুষ হলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা পায় । কিন্তু, মানুষ মানুষ হলে যে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা পায়- এই ধারণা কোত্থেকে পাওয়া।
আমার জানামতে, এ দেশে প্রচলিত ধর্মীয় বা সাধারণ কোন শিক্ষায় সরাসরি এ কথা বলা হয় না যে, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে মানুষ হতে হবে।
তাহলে প্রশ্ন এ ধারণার উৎপত্তি কি হতে পারে ? তবে এস ব কথার আগের প্রশ্ন, মানুষ হতে হলে কি শিক্ষা লাগে ?
শেষের প্রশ্নের জবাবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক টি উদ্ধৃতি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ।
কবিগুরু তাঁর নববর্ষ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘তরুলতা সহজে তরুলতা, পশু পাখী সহজেই পশুপাখি; কিন্তু মানুষ প্রাণ পণ চেষ্টায় অতঃপর মানুষ’ ।
তার মানে মানুষ জন্মগতভাবে মানুষ হয় না । মানুষ হতে গেলে একজন মানুষের নিজের চেষ্টা ও শিক্ষা থাকতে হয় । এখানে প্রশ্ন, মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব কার ?
মানুষকে মানুষ হবার শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব মূলত তাঁর পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের । পরিবার শিক্ষা পায় কোথা য় ?
উত্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ থেকে। আমাদের দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন পাস হয় ১৯৯০ সালে।
সুখের কথা বাংলাদেশে ছিন্নমূলসহ সব শ্রেণির শিশুকি শোর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেতে পারে ।
সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত শিশুকিশোর এনজিও পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।
কিন্তু প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষা দেওয়া হয় বলে আমার জানা নেই । প্রশ্ন হতে পারে, মৌলিক শিক্ষা কি ?
প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীদের জন্য মৌলিক শিক্ষা হচ্ছে, মানুষ হওয়ার শিক্ষা এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদে সর্বস্তরের মানুষে র সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সহঅবস্থানের শিক্ষা ।
এই মৌলিক শিক্ষা না পাওয়ার কারণে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূল লক্ষ্য কি ? তা তিনি জানতে পারেন না ।
একজন শিক্ষার্থীকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনার জীবনের লক্ষ্য কি ? হয়ত তাঁর উত্তর হবে, ডাক্তার হওয়া ।
কেনো ডাক্তার হওয়া ? এ প্রশ্নের উত্তর হবে দরিদ্র মানুষে র চিকিৎসা সেবা দেওয়া, – যা এককথায় মানব সেবা । তাহলে এই শিক্ষার্থীর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন তাঁর লক্ষ্য, না উপলক্ষ্য ?
শিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত লক্ষ্য না জানার কারণে একজন শিক্ষার্থী তাঁর ডাক্তার হওয়ার লক্ষ্য (?) পূরণ করে প্রকৃত ডাক্তার না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে কসাইয়ে রুপান্তরিত হয়ে পড়েন ।
তার মানে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় লক্ষ্য এবং উপল ক্ষ্যের মধ্যে পার্থক্য করা শেখানো হয় না ।
ফলে, এদেশে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় । এই ভুল শিক্ষাদানের কারণে আমাদের বড়দেরও অনেকের জানা হয়না, আমাদের জীবনের আসল উদ্দেশ্য কি ? এসব ভুলের কারণে সামাজিক যে ক্ষতি হয়, তা অপূর ণীয়।
আমাদের সকল ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযো জ্য । এখানে ইসলাম ধর্মের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একজন মুসলমানকে যদি প্রশ্ন করা হয়, মুসলমান হিসে বে তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য কি ?
উত্তরে তিনি বলবেন, আল্লাহর ইবাদত করা। প্রশ্ন, আল্লা হর ইবাদত করা একজন মুসলমানের লক্ষ্য, না উপলক্ষ্য ? উত্তরে তিনি বলবেন, এটি উপলক্ষ্য নয়, একজন মুসল মানের জীবনের লক্ষ্য আল্লাহর ইবাদত করা ।
কারণ, হিসেবে তিনি বলবেন, কোরআনে সূরা জারিয়া তের ৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘জিন ও মানুষকে কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে’ ।
কোরআনে ১১৪ টি সূরার মধ্যে একটি সূরার নাম সূরা জীন । এ ছাড়া কোরআনে হাতেগোণা কয়েকবার জীনের কথা বলা হয়েছে ।
মানুষ তো জীন নয় । এত অল্প কথার মধ্যে কোরআনে যদি জিনের কাজের কথা বলা হয়ে থাকে, তাহলে কোর আনে মানুষ হিসেবে মানুষের কি কাজ করতে বলা হয়েছে ?
এ প্রশ্নের জবাবে অনেকে নিরব থাকলেও, সত্য কথা এই যে, কোরআনে সূরা মূলক এর ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়ে ছে, ‘তোমাদের মধ্যে সৎকাজে কে এগিয়ে আছে, তা পরী ক্ষা করার জন্যই জীবন ও মৃত্যুর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে’ ।
তার মানে সৎকাজ করার জন্যই মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে । তাহলে একজন মানুষের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সৎকা জ করা ।
কিন্তু, সৎকাজ করতে হলে, মানুষকে মানুষ হতে হয় । আগে নিজের মনের কালিমা দূর করতে হয় । এ জন্য একজন মুসলমানকে নামাজ পড়তে হবে বা আল্লাহর ইবাদত করতে হবে ।
এসবের অর্থ একজন মানুষের জীবনের লক্ষ্য সৎকাজ করা এবং উপলক্ষ্য আল্লাহর ইবাদত করা । আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার ধর্মের নাম ইসলাম এবং
কেবলমাত্র সৎকাজের মাধ্যমেই সমাজে শান্তি স্থাপন সম্ভব । ফলে, পীস স্কুলে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টি কোরআন তথা ধর্মীয় শিক্ষা থেকে পাওয়া বলে আমার মনে হয়েছে ।
তবে পীস স্কুলে ইসলাম ধর্মের কথা বেশি বলা হলেও স্কুলটি মূলত সকল ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত । এটা সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি স্কুল ।
শিশুকিশোরদের কল্পনার সাথে স্কুলটি সাজানো যেন ! এখানে সকল শিক্ষক ও অভিভাবক শিক্ষার্থীদের সাথে আপনাআপনি করে সম্মান দিয়ে কথা বলেন । স্কুলের সবকিছু শিক্ষার্থীরা নিজেরা করেন ।
যে প্ল্যাকার্ড তাঁরা বহন করছেন, সেগুলো তাঁদের নিজে দের হাতে তৈরি । সবাই সত্য কথা বলেন । শিক্ষার্থীদের সুকুমারবৃতি জাগানোর জন্য যা যা করা দরকার, এ স্কুলে তার সবই অনুশীলন করানো হয় । শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে আলাদা কোন পড়াশুনা করার প্রয়োজন হয় না।
পীস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জনাব নূরুজ্জামান ফিরোজ ও তাঁর নিজের হাতে গড়া সুদক্ষ সেচ্ছাসেবী দলের প্রতি আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও অশেষ কৃত জ্ঞতা বার্ষিক এই বর্ণাঢ্য শান্তি উৎসবে আমন্ত্রণ জানানো ও চমৎকার আপ্যায়নের জন্য ।
আমার সাথে ছিলেন অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের দু’জন প্রোগ্রাম এমব্যাসেডর- মেহেরপুরের জনাব মোঃ সিরাজুল ইসলাম স্যার এবং জনাব মাশফিক-উজ- জামা ন নিউটন ।
পীস স্কুলের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ আমন্ত্রিত সকল অতিথির প্রতি আমাদের শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইল।
লেখকঃ রাশেদুল ইসলাম । ১৩ জুন, ২০২৬ । মোহাম্মদপুর, ঢাকা ।

Reporter Name 























