Dhaka , Sunday, 8 November 2026
সর্বশেষ:
ঠাকুরগাঁওয়ে ওয়ারিশান সনদে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানোর অভিযোগ প্যানেল চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ঠাকুরগাঁওয়ে ডিবির মাদকবিরোধী অভিযান: ইয়াবাসহ দুই ভাইবোন গ্রেফতার নওগাঁ সদর মডেল থানায় নতুন ওসি হিসেবে মো. মিন্টু রহমানের যোগদান লালপুরে গরম পানি ঢেলে আপন ভাবী ও ভাতিজার শরীর ঝলসে দিল নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা ইমরান আলী চৌগাছায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বিএনপির আলোচনা সভা ও র‌্যালি ক্ষমতার ভাগাভাগি নয়,জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি করছে এবি পার্টি: মজিবুর রহমান মঞ্জু নড়াইলর মুলিয়া ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের ফুটবলার গোপাল হাজরার স্মৃতি কথা!! ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে চান সংস্কৃতিমন্ত্রী- নিতাই রায় চৌধুরী পুঠিয়ায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ পাওনা টাকা চাওয়ায় ছোট ভাইয়ের মাথা ফাটালো বড় ভাই

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে আধুনিক মানবাধিকার ও ইসলাম

  • Reporter Name
  • Update Time : 02:13 pm, Saturday, 6 December 2025
  • 80 Time View

”প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলম ”

আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার (Human Rights) একটি বহুল আলোচিত বিষয়। কিন্তু মানবাধিকারের যে মৌলিক মূল্যবোধ—জীবনের অধিকার, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মর্যাদা, সমতা—ইসলাম ১৪৫০ বছর আগে এগুলোকে স্পষ্ট ধর্মীয় নির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কুরআন ও হাদীস মানবাধিকারকে শুধু একটি নৈতিক আদর্শ নয়; বরং সমাজ-রাষ্ট্রে কার্যকর আইন হিসেবে তুলে ধরেছে। অথচ প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী
১০ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস পালিত হয়।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, প্যারিসে ১৯৪৮ সালের এই দিনে  মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি— সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights – UDHR)—গৃহীত হয়। মানবজাতির মৌলিক অধিকার রক্ষায় এই দিনটির গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো—
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বৈষম্য, নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠন করা।
মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া।
রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিবর্গকে মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে শান্তি, মানবাধিকার এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে এটি গঠন করে।বিশ্ববরেণ্য মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক ও আইন বিশেষজ্ঞরা খসড়া তৈরিতে অংশ নেন।
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা তিনটি ধাপের মাধ্যমে গঠন করা হয়—
১. খসড়া প্রণয়ন: বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে খসড়া তৈরি।
২. আলোচনা ও সংশোধন: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দীর্ঘ আলোচনা, বিতর্ক ও সংশোধনের মাধ্যমে ধারাগুলো পরিমার্জন।
৩. গ্রহণ: ৪৮টি দেশের সমর্থনে UDHR গৃহীত হয়। এটি মানবাধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
** বিশ্বব্যাপী বর্তমান কার্যক্রম:
বর্তমানে ১০ ডিসেম্বর বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়, যেমন—
মানবাধিকার র‍্যালি ও মানববন্ধন
সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও আলোচনা সভা
মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ
গণসচেতনতা তৈরি, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা
মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করা ব্যক্তিদের পুরস্কার প্রদান
শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী, সংখ্যালঘু ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান
বাংলাদেশেও সরকারি , বেসরকারি সংগঠন, মানবাধিকার কমিশন (NHRC), বিভিন্ন এনজিও ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করে।
** আমাদের শিক্ষা (Lessons Learned)
প্রতিটি মানুষ জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ নির্বিশেষে সম্মান পাওয়ার অধিকারী।
মানবাধিকার শুধুমাত্র আইনের বিষয় নয়—এটি মানবিকতা ও নৈতিকতার বিষয়।
যে সমাজে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, সে সমাজে শান্তি ও উন্নয়ন দ্রুত আসে।
নির্যাতন, সহিংসতা বা দমন-পীড়ন কোনো অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য নয়।
মানবাধিকার রক্ষায় সচেতনতা ও নৈতিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
** আমাদের করণীয় :
নিজে মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং অন্যকে সচেতন করা।
পরিবারের মধ্যে, বিদ্যালয়ে, কর্মস্থলে সবাইকে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া।
শিশু, নারী, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষায় দায়িত্ব পালন করা।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে গঠনমূলক প্রতিবাদ করা।
মানবাধিকার লঙ্ঘন দেখলে নীরব না থেকে আইনগত সাহায্য নেওয়া বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।
সামাজিক মাধ্যমে ইতিবাচক ও মানবিক বার্তা প্রচার করা।
** কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষণ:
মানবাধিকারের ইসলামী ভিত্তি
১.  মানুষ সৃষ্টিগতভাবে সম্মানিত
“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” ( সুরা ইসরা  আয়াত নং ৭০) এ আয়াতে ঘোষণা করা হয়—মানুষ জন্মগতভাবে সম্মানের অধিকারী।
২. জীবনের অধিকার (Right to Life)
“যে নিরপরাধ প্রাণকে হত্যা করে, সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল।” (মায়েদা, আয়াত – ৩২) অতএব মানুষ হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৩. ধর্মীয় স্বাধীনতা (Freedom of Religion)
“ধর্মের বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই।” (বাকারা, আয়াত নং ২৫৬)
“তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আর আমার ধর্ম আমার জন্য।” (কাফিরুন আয়াত নং ৬)
কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা নিষিদ্ধ।
মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা সংরক্ষিত ।
৩. ন্যায়বিচার ও আইনের সমতা (Justice & Equality Before Law)
“ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।” (মায়েদা আয়াত নং ৮)
“নিজের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায়বিচারের সাক্ষ্য দাও।” (নিসা আয়াত নং ১৩৫)
বিচার ব্যবস্থায় জাতি, গোত্র, পদ বা সম্পদের প্রভাব নিষিদ্ধ।
অপরাধ করলে ধনী–গরিব সবার জন্য একই শাস্তি।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি গুলো ধ্বংস হয়েছে, কেননা তারা ধনীরা চুরি করলে ছাড় দিত, আর গরিবরা চুরি করলে শাস্তি দিত।” (বুখারি)
৪. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (Freedom of Speech)
“শ্রেষ্ঠ জিহাদ হলো জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।” (নাসাঈ)
ইসলামে গঠনমূলক সমালোচনা করতে  উৎসাহিত করা হয়েছে।
৫. নারী-পুরুষের মর্যাদা ও অধিকার
“নারীদের জন্য যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি অধিকারও আছে।” (বাকারা আয়াত নং ২২৮)
“নারীদের প্রতি উত্তম আচরণ করো।”
(তিরমিজি)
বিবাহ, উত্তরাধিকার, শিক্ষা, সম্পদ—নারীর অধিকার স্বীকৃত।
নবী ﷺ নারীদের সম্মান দিয়ে সমাজে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
৬. শ্রমিকের অধিকার (Workers’ Rights)
“শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দাও।” (ইবনে মাজাহ)
শ্রমিক শোষণ নিষিদ্ধ।
বেতন বিলম্ব করা হারাম।
৭. দাসমুক্তি ও মানবমুক্তির অধিকার
ইসলামের অবস্থান
কুরআন বহু অপরাধের কাফফারা হিসেবে দাসমুক্তি বাধ্যতামূলক করেছে।
দাসের প্রতি ভাইয়ের মতো আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
“তোমাদের দাসরা তোমাদের ভাই। তাদের সঙ্গে ভাইয়ের মতো আচরণ করো।”
— (বুখারি) ইসলামই প্রথম ব্যবস্থা যা দাসপ্রথার শিকল ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়।
৮. দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার
“এতিমকে অবহেলা করো না।” (দুহা আয়াত নং ৯)
এতিম, বিধবা, অসহায়, ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী সবার অধিকার ইসলামে সুরক্ষিত।
** মানবাধিকার বিষয়ে নবী ﷺ এর চার্টার :
১. মক্কার বিদায় হজের ভাষণ—বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণা
রাসুল ﷺ এর বিদায় হজের ভাষণকে বিশ্বের প্রথম মানবাধিকার ঘোষণা বলা হয়। এতে ঘোষিত হয়—
* মানুষের জন্য অন্যের জীবন ও সম্পদ হারাম (অস্পর্শযোগ্য)।
*. জাতিগত ভাবে কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্টত্ব হলো খোদা ভীরুতাই।
* নারী-পুরুষের পারস্পরিক ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা ।
*  সুদ নিষিদ্ধ, ব্যাবসা বৈধ। হারাম জিনিসের কার্যক্রম ও অন্যায় অর্থনীতি বন্ধ।
*  প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা ও ন্যায়বিচার।
** ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমের অধিকার:
“যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে না, তাদের প্রতি দয়া ও ন্যায়বিচার করো।” (মুমতাহিনা আয়াত নং ৮)
রাসুল স: বলেন, “যে অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করে, আমি কিয়ামতে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবো।” (আবু দাউদ) ইসলাম অমুসলিম নাগরিকের নিরাপত্তা, বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করেছে।
জীবনের মৌলিক অধিকার ঈমানী নির্দেশ , মানবাধিকার
সমতা তাকওয়া ছাড়া শ্রেষ্ঠত্ব নেই। জাতি–ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে  সবাই সমান।
ইসলামের অনেক নীতিই আধুনিক মানবাধিকারের আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।
** আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় :১. মানুষ জন্মগতভাবে সম্মানিত—কাউকে অপমান করা হারাম।
২. ন্যায়বিচার ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু।
৩. ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামের মৌলিক নীতি।
৪. নারী-পুরুষ সবার অধিকার আল্লাহ নির্ধারিত।
৫. সমাজের দুর্বল ও অসহায়দের অধিকার রক্ষা ঈমানের অঙ্গ।
৬. রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়ের দায়িত্ব মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
কুরআন ও হাদীস মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্থান দিয়েছে। আধুনিক সভ্যতা যা আজ দাবি করে—ইসলাম তা বহু শতাব্দী পূর্বেই আইন, আদর্শ ও নৈতিকতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
“মানুষ হিসেবে মানুষকে মর্যাদা দেওয়াই মানবতার প্রকৃত শক্তি।”
ইসলামিক মানবাধিকার শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং বাস্তব সমাজ গঠনের পূর্ণাঙ্গ নীতি। তাই মানবাধিকারের প্রকৃত রূপ খুঁজতে হলে আমাদেরকেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক ভাবে কুরআন ও সুন্নাহর নীতিমালার অনুস্মরণ করতে হবে।
## লেখক : প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী। ০১৯১১৬০৪৪৫৫
About Author Information

Popular Post

ঠাকুরগাঁওয়ে ওয়ারিশান সনদে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানোর অভিযোগ প্যানেল চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে আধুনিক মানবাধিকার ও ইসলাম

Update Time : 02:13 pm, Saturday, 6 December 2025

”প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলম ”

আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার (Human Rights) একটি বহুল আলোচিত বিষয়। কিন্তু মানবাধিকারের যে মৌলিক মূল্যবোধ—জীবনের অধিকার, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মর্যাদা, সমতা—ইসলাম ১৪৫০ বছর আগে এগুলোকে স্পষ্ট ধর্মীয় নির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কুরআন ও হাদীস মানবাধিকারকে শুধু একটি নৈতিক আদর্শ নয়; বরং সমাজ-রাষ্ট্রে কার্যকর আইন হিসেবে তুলে ধরেছে। অথচ প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী
১০ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস পালিত হয়।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, প্যারিসে ১৯৪৮ সালের এই দিনে  মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি— সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights – UDHR)—গৃহীত হয়। মানবজাতির মৌলিক অধিকার রক্ষায় এই দিনটির গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো—
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বৈষম্য, নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠন করা।
মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া।
রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিবর্গকে মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে শান্তি, মানবাধিকার এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে এটি গঠন করে।বিশ্ববরেণ্য মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক ও আইন বিশেষজ্ঞরা খসড়া তৈরিতে অংশ নেন।
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা তিনটি ধাপের মাধ্যমে গঠন করা হয়—
১. খসড়া প্রণয়ন: বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে খসড়া তৈরি।
২. আলোচনা ও সংশোধন: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দীর্ঘ আলোচনা, বিতর্ক ও সংশোধনের মাধ্যমে ধারাগুলো পরিমার্জন।
৩. গ্রহণ: ৪৮টি দেশের সমর্থনে UDHR গৃহীত হয়। এটি মানবাধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
** বিশ্বব্যাপী বর্তমান কার্যক্রম:
বর্তমানে ১০ ডিসেম্বর বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়, যেমন—
মানবাধিকার র‍্যালি ও মানববন্ধন
সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও আলোচনা সভা
মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ
গণসচেতনতা তৈরি, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা
মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করা ব্যক্তিদের পুরস্কার প্রদান
শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী, সংখ্যালঘু ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান
বাংলাদেশেও সরকারি , বেসরকারি সংগঠন, মানবাধিকার কমিশন (NHRC), বিভিন্ন এনজিও ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করে।
** আমাদের শিক্ষা (Lessons Learned)
প্রতিটি মানুষ জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ নির্বিশেষে সম্মান পাওয়ার অধিকারী।
মানবাধিকার শুধুমাত্র আইনের বিষয় নয়—এটি মানবিকতা ও নৈতিকতার বিষয়।
যে সমাজে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, সে সমাজে শান্তি ও উন্নয়ন দ্রুত আসে।
নির্যাতন, সহিংসতা বা দমন-পীড়ন কোনো অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য নয়।
মানবাধিকার রক্ষায় সচেতনতা ও নৈতিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
** আমাদের করণীয় :
নিজে মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং অন্যকে সচেতন করা।
পরিবারের মধ্যে, বিদ্যালয়ে, কর্মস্থলে সবাইকে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া।
শিশু, নারী, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষায় দায়িত্ব পালন করা।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে গঠনমূলক প্রতিবাদ করা।
মানবাধিকার লঙ্ঘন দেখলে নীরব না থেকে আইনগত সাহায্য নেওয়া বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।
সামাজিক মাধ্যমে ইতিবাচক ও মানবিক বার্তা প্রচার করা।
** কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষণ:
মানবাধিকারের ইসলামী ভিত্তি
১.  মানুষ সৃষ্টিগতভাবে সম্মানিত
“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” ( সুরা ইসরা  আয়াত নং ৭০) এ আয়াতে ঘোষণা করা হয়—মানুষ জন্মগতভাবে সম্মানের অধিকারী।
২. জীবনের অধিকার (Right to Life)
“যে নিরপরাধ প্রাণকে হত্যা করে, সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল।” (মায়েদা, আয়াত – ৩২) অতএব মানুষ হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৩. ধর্মীয় স্বাধীনতা (Freedom of Religion)
“ধর্মের বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই।” (বাকারা, আয়াত নং ২৫৬)
“তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আর আমার ধর্ম আমার জন্য।” (কাফিরুন আয়াত নং ৬)
কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা নিষিদ্ধ।
মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা সংরক্ষিত ।
৩. ন্যায়বিচার ও আইনের সমতা (Justice & Equality Before Law)
“ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।” (মায়েদা আয়াত নং ৮)
“নিজের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায়বিচারের সাক্ষ্য দাও।” (নিসা আয়াত নং ১৩৫)
বিচার ব্যবস্থায় জাতি, গোত্র, পদ বা সম্পদের প্রভাব নিষিদ্ধ।
অপরাধ করলে ধনী–গরিব সবার জন্য একই শাস্তি।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি গুলো ধ্বংস হয়েছে, কেননা তারা ধনীরা চুরি করলে ছাড় দিত, আর গরিবরা চুরি করলে শাস্তি দিত।” (বুখারি)
৪. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (Freedom of Speech)
“শ্রেষ্ঠ জিহাদ হলো জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।” (নাসাঈ)
ইসলামে গঠনমূলক সমালোচনা করতে  উৎসাহিত করা হয়েছে।
৫. নারী-পুরুষের মর্যাদা ও অধিকার
“নারীদের জন্য যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি অধিকারও আছে।” (বাকারা আয়াত নং ২২৮)
“নারীদের প্রতি উত্তম আচরণ করো।”
(তিরমিজি)
বিবাহ, উত্তরাধিকার, শিক্ষা, সম্পদ—নারীর অধিকার স্বীকৃত।
নবী ﷺ নারীদের সম্মান দিয়ে সমাজে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
৬. শ্রমিকের অধিকার (Workers’ Rights)
“শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দাও।” (ইবনে মাজাহ)
শ্রমিক শোষণ নিষিদ্ধ।
বেতন বিলম্ব করা হারাম।
৭. দাসমুক্তি ও মানবমুক্তির অধিকার
ইসলামের অবস্থান
কুরআন বহু অপরাধের কাফফারা হিসেবে দাসমুক্তি বাধ্যতামূলক করেছে।
দাসের প্রতি ভাইয়ের মতো আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
“তোমাদের দাসরা তোমাদের ভাই। তাদের সঙ্গে ভাইয়ের মতো আচরণ করো।”
— (বুখারি) ইসলামই প্রথম ব্যবস্থা যা দাসপ্রথার শিকল ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়।
৮. দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার
“এতিমকে অবহেলা করো না।” (দুহা আয়াত নং ৯)
এতিম, বিধবা, অসহায়, ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী সবার অধিকার ইসলামে সুরক্ষিত।
** মানবাধিকার বিষয়ে নবী ﷺ এর চার্টার :
১. মক্কার বিদায় হজের ভাষণ—বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণা
রাসুল ﷺ এর বিদায় হজের ভাষণকে বিশ্বের প্রথম মানবাধিকার ঘোষণা বলা হয়। এতে ঘোষিত হয়—
* মানুষের জন্য অন্যের জীবন ও সম্পদ হারাম (অস্পর্শযোগ্য)।
*. জাতিগত ভাবে কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্টত্ব হলো খোদা ভীরুতাই।
* নারী-পুরুষের পারস্পরিক ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা ।
*  সুদ নিষিদ্ধ, ব্যাবসা বৈধ। হারাম জিনিসের কার্যক্রম ও অন্যায় অর্থনীতি বন্ধ।
*  প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা ও ন্যায়বিচার।
** ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমের অধিকার:
“যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে না, তাদের প্রতি দয়া ও ন্যায়বিচার করো।” (মুমতাহিনা আয়াত নং ৮)
রাসুল স: বলেন, “যে অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করে, আমি কিয়ামতে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবো।” (আবু দাউদ) ইসলাম অমুসলিম নাগরিকের নিরাপত্তা, বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করেছে।
জীবনের মৌলিক অধিকার ঈমানী নির্দেশ , মানবাধিকার
সমতা তাকওয়া ছাড়া শ্রেষ্ঠত্ব নেই। জাতি–ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে  সবাই সমান।
ইসলামের অনেক নীতিই আধুনিক মানবাধিকারের আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।
** আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় :১. মানুষ জন্মগতভাবে সম্মানিত—কাউকে অপমান করা হারাম।
২. ন্যায়বিচার ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু।
৩. ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামের মৌলিক নীতি।
৪. নারী-পুরুষ সবার অধিকার আল্লাহ নির্ধারিত।
৫. সমাজের দুর্বল ও অসহায়দের অধিকার রক্ষা ঈমানের অঙ্গ।
৬. রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়ের দায়িত্ব মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
কুরআন ও হাদীস মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্থান দিয়েছে। আধুনিক সভ্যতা যা আজ দাবি করে—ইসলাম তা বহু শতাব্দী পূর্বেই আইন, আদর্শ ও নৈতিকতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
“মানুষ হিসেবে মানুষকে মর্যাদা দেওয়াই মানবতার প্রকৃত শক্তি।”
ইসলামিক মানবাধিকার শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং বাস্তব সমাজ গঠনের পূর্ণাঙ্গ নীতি। তাই মানবাধিকারের প্রকৃত রূপ খুঁজতে হলে আমাদেরকেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক ভাবে কুরআন ও সুন্নাহর নীতিমালার অনুস্মরণ করতে হবে।
## লেখক : প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী। ০১৯১১৬০৪৪৫৫