:আফজাল হোসেন চাঁদ:
পৃথিবীতে মানুষের আগমন একা, বিদায়ও একা। জন্মের পর থেকেই মানুষ নানা সম্পর্ক, দায়িত্ব, ভালোবাসা, স্বপ্ন, আশা ও প্রত্যাশার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে।
পৃথিবীতে মানুষের আগমন একা, বিদায়ও একা। জন্মের পর থেকেই মানুষ নানা সম্পর্ক, দায়িত্ব, ভালোবাসা, স্বপ্ন, আশা ও প্রত্যাশার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে।
মা-বাবা, ভাই-বোন, জীবনসঙ্গী, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী সবাইকে নিয়েই গড়ে ওঠে জীবনের দীর্ঘ পথচলা।
এই সম্পর্কগুলো মানুষকে বাঁচতে শেখায়, সংগ্রামের শক্তি দেয়, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় একটি সত্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই পৃথিবী আসলে মায়ার বাঁধন।
শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষকেই নিজের পথ একাই অতিক্র ম করতে হয়। “কেউ কারও নয়” বাক্যটি প্রথম শুনলে কঠোর কিংবা হতাশাব্যঞ্জক মনে হতে পারে।
কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থ মানুষকে সম্পর্কহীন হতে শেখা নো নয়; বরং সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে শেখানো।
বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর সব সম্পর্কই সময়, পরিস্থিতি ও জীবনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ। কেউ চাইলেও সারাজীবন কারও পাশে থাকতে পারে না।
জীবন, মৃত্যু, সময় ও নিয়তির কাছে সবাই একসময় অস হায় হয়ে পড়ে। মানুষ যখন সফল হয়, অর্থ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদায় উন্নতি লাভ করে, তখন তার চারপাশে মানুষের অভাব থাকে না।
প্রশংসা, সম্মান, আত্মীয়তা ও বন্ধুত্ব যেন হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরে যখন সংকট আসে, অসুস্থতা, দারিদ্র্য কিংবা দুর্বলতা জীবনে প্রবেশ করে, তখন অনেক পরিচিত মুখই ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যায়।
তখন উপলব্ধি হয় সব সম্পর্ক সমান নয়; কিছু সম্পর্ক স্বার্থের, আবার কিছু সম্পর্ক ভালোবাসা, দায়িত্ব ও মানবি কতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। বাস্তব জীবনে আমরা প্রায়ই দেখি, সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের দূরত্ব সৃষ্টি হয়, উত্তরাধিকার নিয়ে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হয়, সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতে বহু বছরের বন্ধুত্ব ভেঙে যায়।
আবার অন্যদিকে, কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও একজন অপরিচিত মানুষ বিপদের দিনে এগিয়ে এসে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
এসব ঘটনাই আমাদের শেখায় সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি রক্ত নয়, সম্পদ নয়, বরং সততা, সহমর্মিতা, বিশ্বাস ও মানবিকতা।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পৃথিবীর জীবনকে ক্ষণ স্থায়ী বলা হয়েছে। সব ধর্ম ও নৈতিক দর্শন মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবী চিরস্থায়ী আবাস নয়; এটি কর্মের ক্ষেত্র, পরীক্ষার স্থান।
মানুষ এখানে অতিথি মাত্র। যা কিছু আমাদের হাতে রয়ে ছে সম্পদ, পরিবার, সম্মান, ক্ষমতা সবই সাময়িক আমা নত।
নির্ধারিত সময় শেষে সবকিছু রেখে মানুষকে বিদায় নিতে হবে। তখন সঙ্গে যাবে না কোনো অর্থ-সম্পদ, পদ-পদবি কিংবা বাহ্যিক পরিচয়; সঙ্গে থাকবে কেবল তার কর্ম, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সৎ আমল।
ইসলামী শিক্ষায় দুনিয়ার জীবনকে ক্ষণস্থায়ী এবং পরকা লকে চিরস্থায়ী বলা হয়েছে। একইভাবে অন্যান্য ধর্ম ও দর্শনও মানুষকে আত্মশুদ্ধি, সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমাশীলতা ও সেবার শিক্ষা দেয়।
অর্থাৎ আধ্যাত্মিকতার মূল শিক্ষা বিভেদ নয়, বরং আত্ম সমালোচনা, বিনয় ও মানবকল্যাণ। তাই “কেউ কারও নয়” উপলব্ধির প্রকৃত অর্থ সম্পর্ক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়; বরং সম্পর্ককে দায়িত্ব ও মানবিকতার আলো য় আলোকিত করা। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে যোগাযোগ সহজ হয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের সংযোগ অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত কিংবা হাজার হা জার পরিচিত মানুষের তালিকা থাকলেও বাস্তব জীব নের একাকীত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
মানুষ আজ ভার্চুয়াল প্রশংসা পেলেও বাস্তব সহমর্মিতা অনেক সময় খুঁজে পায় না। ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা মানুষের পারিবারিক ও সামা জিক বন্ধনকে আগের তুলনায় দুর্বল করে তুলছে।
এর ফলে মানসিক অস্থিরতা, হতাশা এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ বৃদ্ধ মা-বাবার নিঃসঙ্গ জীবন, বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি, সম্পদের জন্য মামলা-মোকদ্দমা, পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য ভাঙন কিংবা আত্মীয়তার অবক্ষয় আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো কেবল সামাজিক সংকট নয়; এগুলো মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরও প্রতিফলন।
অথচ মানুষ যদি উপলব্ধি করত যে পৃথিবীর সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, তাহলে হয়তো অহংকার, লোভ, প্রতারণা ও বিদ্বেষ অনেকটাই কমে যেত।
বাস্তবতা হলো, মানুষ মানুষকে প্রয়োজনের কারণে খোঁ জে, আবার অনেকেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণেও পাশে থাকে। তাই পৃথিবীর সব সম্পর্ককে অবিশ্বাসের চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
বরং প্রয়োজন সত্যিকারের সম্পর্ককে মূল্য দেওয়া এবং স্বার্থনির্ভর সম্পর্ককে চিনে নেওয়ার প্রজ্ঞা অর্জন করা। কারণ ভালো মানুষ এখনো আছে, মানবতা এখনো বেঁচে আছে, সহানুভূতি এখনো পৃথিবীকে সুন্দর করে রাখছে।
জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানুষকে ভালোবাসতে হবে, কিন্তু কাউকে নিয়ে অহংকার বা অন্ধ নির্ভরতার মধ্যে ডুবে যাওয়া উচিত নয়। কারণ পরিবর্তনই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
মানুষ বদলায়, সময় বদলায়, পরি স্থিতি বদলায়। কিন্তু সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিকতা এবং সৎকর্মের মূল্য কখনো নষ্ট হয় না। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সম্পদে নয়, বরং তার চরিত্র, আচরণ এবং অন্য মানুষের জন্য রেখে যাওয়া কল্যাণে।
আমাদের সমাজে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ব বোধ ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা যত বাড়বে, ততই সম্পর্কের ভিত্তি দৃঢ় হবে। পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে ন্যায়বিচার, কর্মক্ষেত্রে সততা এবং রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরবে।
তখন “কেউ কারো নয়” ক থাটি হতাশার প্রতীক হবে না; বরং মানুষ বুঝবে সবাই সাময়িক পথের সঙ্গী, তাই একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করাই মানবতার দাবি।
পৃথিবীর মায়া মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়, সৃষ্টি করতে শেখায়। আবার এই মায়াই মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় সবকিছু একদিন শেষ হয়ে যাবে।
তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অর্থবহ করে তোলা, অন্যের উপকারে আসা, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকা, বৈষম্য, বিদ্বে ষ ও অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করাই হওয়া উচিত আমাদের জীবনের প্রধান অঙ্গী কার।
পরিশেষে বলা যায়, “এই পৃথিবীটা শুধু মায়ার বাঁধন; পরি শেষে কেউ কারও নয়” এটি হতাশার দর্শন নয়, বরং বাস্ত বতা, আত্মজিজ্ঞাসা এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির এক গভীর আহ্বান।
এই উপলব্ধি মানুষকে সম্পর্কহীন নয়, বরং দায়িত্বশীল হতে শেখায়; অহংকারী নয়, বিনয়ী হতে শেখায়; স্বার্থপর নয়, মানবিক হতে উদ্বুদ্ধ করে।
পৃথিবীতে মানুষ ক্ষণিকের অতিথি, কিন্তু তার কর্ম, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ভালোবা সা এবং মানবকল্যাণের অবদা নই তাকে মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখে। তাই মায়ার এই পৃথিবীতে থেকেও আমাদের উচিত সত্য, ন্যায়, সহমর্মিতা, মানবতা ও স্রষ্টার প্রতি দায়বদ্ধতার আলোয় নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করা। তবেই ক্ষণস্থায়ী জীবনের ভেতরেও আমরা খুঁজে পাব স্থায়ী শান্তি, অর্থপূর্ণ জীবন এবং প্রকৃত সফলতার স্বাদ।
-লেখক ও কলামিষ্ট : আফজাল হোসেন চাঁদ, সংবাদকর্মী, ঝিকরগাছা, যশোর।
—

Reporter Name 

























