Dhaka , Sunday, 8 November 2026

সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারই বাজেট বাস্তবায়নের সাফল্যের চাবিকাঠিঃ আফজাল হোসেন চাঁদ

:আফজাল হোসেন চাঁদ:
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থা পনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে সরকারের পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
একটি জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের রূপরেখা। বাজেটের মাধ্যমে সরকার জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং উন্নয়নের অগ্রাধিকারগুলো নির্ধারণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাজেটের সফলতা শুধু বরাদ্দের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব কতটা দৃশ্যমান হচ্ছে তার ওপর।
একজন সাধারণ মানুষ যখন বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস কিংবা ওষুধ কিনতে হিমশিম খান, তখন হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের খবর তার কাছে খুব বেশি স্বস্তি বয়ে আনে না।
তাই বাজেট বাস্তবায়নের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায় বাজার পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেটমুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কারণ বাজার যদি অস্থিতিশীল থাকে, তাহলে বাজেটের অনেক ইতিবাচক উদ্যোগও কাঙ্খিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় গুলোর একটি হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম কমবেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
চাল, আটা, ভোজ্যতেল, ডিম, চিনি, পেঁয়া জ, আলু, আদা, রসুন থেকে শুরু করে মাছ ও মাংসের বাজারেও অস্থির তা লক্ষ্য করা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব ছিল, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাকৃ তিক দুর্যোগ বা উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু এসব বাস্তব কারণের পাশাপাশি দেশের বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভি যোগও বারবার সামনে এসেছে।
দেশের মানুষ বহুবার প্রত্যক্ষ করেছে যে কোনো পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
পেঁয়াজের বাজার তার অন্যতম উদাহ রণ। বিভিন্ন সময়ে দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানি কার্য ক্রম চলমান থাকার পরও বাজারে পেঁয়াজের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে ডিম, ভোজ্যতেল এবং চিনির বাজারেও। সাধারণ মানুষ তখন প্রশ্ন করেছে যদি উৎপাদন থাকে, আমদানি থাকে এবং সরবরাহ ব্যব স্থা সচল থাকে, তাহলে দাম বাড়ে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাজার সিন্ডিকেটের প্রসঙ্গ সামনে আসে। অর্থনীতির ভাষায় সিন্ডিকেট বলতে এমন একটি গোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা নিজেদের স্বার্থে বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ব্যাহত করে মূল্য, সরবরাহ কিংবা বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
যখন কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা জারের ওপর অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করে, তখন সাধারণ ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাজার তখন আর চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক নিয়মে পরিচালিত হয় না; বরং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়। বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাব শুধু মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপ্র কৃতিকেও ব্যাহত করে। যখন কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জ ন করে, তখন সৎ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
বাজারে নৈতিক ব্যবসার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যেতে পারে।
ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মোটেও শুভ নয়।
দেশের কৃষি খাতের বাস্তবতা এই সমস্যাকে আরও স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরে। একজন কৃষক সারা বছর পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করেন।
কিন্তু ফসল ঘরে তোলার সময় তিনি অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য মূল্য পান না। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন।
অন্যদিকে সেই একই পণ্য কয়েক হাত ঘুরে শহরের বা জারে পৌঁছানোর পর কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। অর্থাৎ কৃষক লাভবান হন না, ভোক্তাও স্বস্তি পান না; বরং মধ্যবর্তী একটি গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করে।
প্রশ্ন হলো, উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে এই অতিরিক্ত মুনাফা কোথায় যাচ্ছে? কেন কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না এবং কেন ভোক্তাকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণ করতে হবে।
বাজারে কোথায় অস্বচ্ছতা রয়েছে, কোথায় অযৌক্তিক মুনাফা হচ্ছে এবং কোথায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে  সেসব বিষয় চিহ্নিত করা জরুরি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা,অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দ দিয়েছে।
এসব খাতে বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক কর্ম কাণ্ড বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। কিন্তু বাজারে যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে এসব উদ্যো গের কার্যকারিতা অনেকাংশে কমে যায়।
কারণ মানুষের প্রকৃত আয় নির্ধারিত হয় শুধু আয়ের পরি মাণ দিয়ে নয়; বরং সেই আয় দিয়ে কতটুকু পণ্য ও সেবা কেনা যায়, তার ওপর। যখন বাজারে দ্রব্যমূল্য দ্রুত বাড়ে, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
একজন চাকরিজীবী, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা অবস রপ্রাপ্ত ব্যক্তি সবার জীবনেই এর প্রভাব পড়ে।
পরিবারগুলোকে ব্যয় সংকোচন করতে হয়, প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হয়।
ফলে অর্থনীতির ভোগব্যয়ও প্রভাবিত হয়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক নয়। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযান, প্রশাসনের বাজার তদা রকি, প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সহজীকরণ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম ইতিবাচক ফলও দিয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগের কারণে বাজারে অস্থিরতা কমেছে এবং ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে বাস্ত বতা হলো, সমস্যার মূল শিকড়ে পৌঁছাতে না পারলে সাম য়িক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।
বাজারকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোন পণ্যের কত উৎ পাদন হয়েছে, কত আমদানি হয়েছে, কোথায় কত মজুত রয়েছে এবং কোন পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এসব তথ্য সরকারের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে থাকা প্রয়োজন।
তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বাজার কারসাজি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়মিত নিরীক্ষা, তথ্য প্রকাশ এবং আইন প্রয়োগের কার্যকর ব্যব স্থা প্রয়োজন। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে পর্যাপ্ত হিমাগার, আধু নিক গুদাম এবং সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কৃষকরা উৎপাদনের মৌসুমে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগও কমে যাবে।
কৃষক থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর উদ্যোগ বাড়ানো গেলে মধ্যস্বত্ব ভোগীদের অযৌক্তিক প্রভাবও হ্রাস পাবে। বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সমাজের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করেন। কিন্তু অল্পসংখ্যক অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো ব্যবসায়ী সমাজের ভাবমূর্তি প্রশ্ন বিদ্ধ হয়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উচিত বাজারে নৈতিক ব্যবসা পরিচালনার সংস্কৃতি জোরদার করা এবং অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।
গণমাধ্যমের ভূমি কাও এখানে উল্লেখযোগ্য। বাজারে কারসাজি, মজুতদারি এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
একই সঙ্গে সচেতন ভোক্তা সমাজ গড়ে তুলতেও গণমা ধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের এই সময়ে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো জনগণের আস্থা অর্জন। জনগণ তখনই সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতি আস্থা রাখবে, যখন তারা বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় থাকলে, কৃত্রিম সং কট না থাকলে এবং বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় থাকলে বাজেটের সুফল বাস্তব অর্থেই মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে।
জাতীয় বাজেটের সফলতা শুধু রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন ব্যয় বা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি বাজেট তখনই সফল হয়, যখন তার প্রভাব সাধারণ
মানু ষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। বাজা রে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থা কে, মূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে এবং কোনো অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, তাহলে জনগণ সরা সরি বাজেটের সুফল অনুভব করবে।
অন্যদিকে বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বাজেটের বহু ইতিবাচক উদ্যো গও প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হবে। ফলে উন্নয়নের সুফল বাস্তব অর্থে মানুষের ঘরে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হবে।
তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, ব্যবসায়ী সমাজ, কৃষক, ভোক্তা এবং নাগরিক সমাজ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক বাজা র ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে হলে বাজেট বাস্ত বায়নের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থার সংস্কার এবং সিন্ডি কেট নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি স্থিতিশীল বাজারই পারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করতে।
আর জনগণের আস্থাই হলো যেকো নো অর্থনৈতিক পরি কল্পনার সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারই বাজেট বাস্তবায়নের সাফ ল্যের চাবিকাঠি।  আফজাল হোসেন চাঁদ, সংবাদকর্মী, ঝিকর গাছা, যশোর।

—

About Author Information

Popular Post

সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারই বাজেট বাস্তবায়নের সাফল্যের চাবিকাঠিঃ আফজাল হোসেন চাঁদ

Update Time : 07:02 pm, Friday, 12 June 2026
:আফজাল হোসেন চাঁদ:
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থা পনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে সরকারের পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
একটি জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের রূপরেখা। বাজেটের মাধ্যমে সরকার জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং উন্নয়নের অগ্রাধিকারগুলো নির্ধারণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাজেটের সফলতা শুধু বরাদ্দের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব কতটা দৃশ্যমান হচ্ছে তার ওপর।
একজন সাধারণ মানুষ যখন বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস কিংবা ওষুধ কিনতে হিমশিম খান, তখন হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের খবর তার কাছে খুব বেশি স্বস্তি বয়ে আনে না।
তাই বাজেট বাস্তবায়নের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায় বাজার পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেটমুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কারণ বাজার যদি অস্থিতিশীল থাকে, তাহলে বাজেটের অনেক ইতিবাচক উদ্যোগও কাঙ্খিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় গুলোর একটি হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম কমবেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
চাল, আটা, ভোজ্যতেল, ডিম, চিনি, পেঁয়া জ, আলু, আদা, রসুন থেকে শুরু করে মাছ ও মাংসের বাজারেও অস্থির তা লক্ষ্য করা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব ছিল, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাকৃ তিক দুর্যোগ বা উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু এসব বাস্তব কারণের পাশাপাশি দেশের বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভি যোগও বারবার সামনে এসেছে।
দেশের মানুষ বহুবার প্রত্যক্ষ করেছে যে কোনো পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
পেঁয়াজের বাজার তার অন্যতম উদাহ রণ। বিভিন্ন সময়ে দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানি কার্য ক্রম চলমান থাকার পরও বাজারে পেঁয়াজের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে ডিম, ভোজ্যতেল এবং চিনির বাজারেও। সাধারণ মানুষ তখন প্রশ্ন করেছে যদি উৎপাদন থাকে, আমদানি থাকে এবং সরবরাহ ব্যব স্থা সচল থাকে, তাহলে দাম বাড়ে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাজার সিন্ডিকেটের প্রসঙ্গ সামনে আসে। অর্থনীতির ভাষায় সিন্ডিকেট বলতে এমন একটি গোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা নিজেদের স্বার্থে বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ব্যাহত করে মূল্য, সরবরাহ কিংবা বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
যখন কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা জারের ওপর অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করে, তখন সাধারণ ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাজার তখন আর চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক নিয়মে পরিচালিত হয় না; বরং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়। বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাব শুধু মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপ্র কৃতিকেও ব্যাহত করে। যখন কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জ ন করে, তখন সৎ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
বাজারে নৈতিক ব্যবসার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যেতে পারে।
ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মোটেও শুভ নয়।
দেশের কৃষি খাতের বাস্তবতা এই সমস্যাকে আরও স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরে। একজন কৃষক সারা বছর পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করেন।
কিন্তু ফসল ঘরে তোলার সময় তিনি অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য মূল্য পান না। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন।
অন্যদিকে সেই একই পণ্য কয়েক হাত ঘুরে শহরের বা জারে পৌঁছানোর পর কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। অর্থাৎ কৃষক লাভবান হন না, ভোক্তাও স্বস্তি পান না; বরং মধ্যবর্তী একটি গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করে।
প্রশ্ন হলো, উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে এই অতিরিক্ত মুনাফা কোথায় যাচ্ছে? কেন কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না এবং কেন ভোক্তাকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণ করতে হবে।
বাজারে কোথায় অস্বচ্ছতা রয়েছে, কোথায় অযৌক্তিক মুনাফা হচ্ছে এবং কোথায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে  সেসব বিষয় চিহ্নিত করা জরুরি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা,অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দ দিয়েছে।
এসব খাতে বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক কর্ম কাণ্ড বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। কিন্তু বাজারে যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে এসব উদ্যো গের কার্যকারিতা অনেকাংশে কমে যায়।
কারণ মানুষের প্রকৃত আয় নির্ধারিত হয় শুধু আয়ের পরি মাণ দিয়ে নয়; বরং সেই আয় দিয়ে কতটুকু পণ্য ও সেবা কেনা যায়, তার ওপর। যখন বাজারে দ্রব্যমূল্য দ্রুত বাড়ে, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
একজন চাকরিজীবী, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা অবস রপ্রাপ্ত ব্যক্তি সবার জীবনেই এর প্রভাব পড়ে।
পরিবারগুলোকে ব্যয় সংকোচন করতে হয়, প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হয়।
ফলে অর্থনীতির ভোগব্যয়ও প্রভাবিত হয়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক নয়। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযান, প্রশাসনের বাজার তদা রকি, প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সহজীকরণ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম ইতিবাচক ফলও দিয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগের কারণে বাজারে অস্থিরতা কমেছে এবং ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে বাস্ত বতা হলো, সমস্যার মূল শিকড়ে পৌঁছাতে না পারলে সাম য়িক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।
বাজারকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোন পণ্যের কত উৎ পাদন হয়েছে, কত আমদানি হয়েছে, কোথায় কত মজুত রয়েছে এবং কোন পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এসব তথ্য সরকারের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে থাকা প্রয়োজন।
তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বাজার কারসাজি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়মিত নিরীক্ষা, তথ্য প্রকাশ এবং আইন প্রয়োগের কার্যকর ব্যব স্থা প্রয়োজন। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে পর্যাপ্ত হিমাগার, আধু নিক গুদাম এবং সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কৃষকরা উৎপাদনের মৌসুমে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগও কমে যাবে।
কৃষক থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর উদ্যোগ বাড়ানো গেলে মধ্যস্বত্ব ভোগীদের অযৌক্তিক প্রভাবও হ্রাস পাবে। বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সমাজের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করেন। কিন্তু অল্পসংখ্যক অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো ব্যবসায়ী সমাজের ভাবমূর্তি প্রশ্ন বিদ্ধ হয়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উচিত বাজারে নৈতিক ব্যবসা পরিচালনার সংস্কৃতি জোরদার করা এবং অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।
গণমাধ্যমের ভূমি কাও এখানে উল্লেখযোগ্য। বাজারে কারসাজি, মজুতদারি এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
একই সঙ্গে সচেতন ভোক্তা সমাজ গড়ে তুলতেও গণমা ধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের এই সময়ে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো জনগণের আস্থা অর্জন। জনগণ তখনই সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতি আস্থা রাখবে, যখন তারা বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় থাকলে, কৃত্রিম সং কট না থাকলে এবং বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় থাকলে বাজেটের সুফল বাস্তব অর্থেই মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে।
জাতীয় বাজেটের সফলতা শুধু রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন ব্যয় বা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি বাজেট তখনই সফল হয়, যখন তার প্রভাব সাধারণ
মানু ষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। বাজা রে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থা কে, মূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে এবং কোনো অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, তাহলে জনগণ সরা সরি বাজেটের সুফল অনুভব করবে।
অন্যদিকে বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বাজেটের বহু ইতিবাচক উদ্যো গও প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হবে। ফলে উন্নয়নের সুফল বাস্তব অর্থে মানুষের ঘরে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হবে।
তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, ব্যবসায়ী সমাজ, কৃষক, ভোক্তা এবং নাগরিক সমাজ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক বাজা র ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে হলে বাজেট বাস্ত বায়নের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থার সংস্কার এবং সিন্ডি কেট নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি স্থিতিশীল বাজারই পারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করতে।
আর জনগণের আস্থাই হলো যেকো নো অর্থনৈতিক পরি কল্পনার সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারই বাজেট বাস্তবায়নের সাফ ল্যের চাবিকাঠি।  আফজাল হোসেন চাঁদ, সংবাদকর্মী, ঝিকর গাছা, যশোর।

—