Breaking News

বিশ্ব বাঘ দিবস আজ

ফকির গোলাম তাবরেজ, বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
এক সময় সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকার ছিল অনেকের কাছে সাহসিকতার প্রতীক।
সংঘবদ্ধ শিকারিরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে বনে প্রবেশ করে বাঘ হত্যা করে ফিরত বিজয়ীর বেশে।
কার্যকর আইন, নজরদারি ও জনসচেতনতার অভাবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সবচেয়ে গুরু ত্বপূর্ণ এই প্রাণীটি তখন ছিল চরম হুমকির মুখে।
কিন্তু সময় বদলেছে। কঠোর আইন প্রয়োগ, স্মার্ট পেট্রো লিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি এবং স্থানীয় জন গণের অংশগ্রহণে বর্তমানে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবুও চোরা শিকার, পাচার, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ত তা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো নানা হুমকি এখনো সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় উদ্বেগ।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ শুধু এক টি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরা পত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে, যখন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদে শের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়।
পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আই নে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়। এরপর থেকে বন বিভাগ প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমা রিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দাঁড়িয়ে ছে ১২৫টি। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০৬টি এবং ২০ ১৮ সালে ছিল ১১৪টি।
ধারাবাহিক এই বৃদ্ধি সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে গত প্রায় আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।
এর মধ্যে চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রাম বাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধ ক্যে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা গেছে।
এছাড়া উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বাঘের চামড়ার সূত্র ধরে আ রও কয়েকটি বাঘ পাচারের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেসব ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষিত নেই।
একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। স্মার্ট পেট্রোলিং, নিয়মিত টহল, ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের ব্যবহার, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মানুষ-বাঘের সংঘাত কমেছে।
এর ইতিবাচক ফল হিসেবে ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দ রবনে কোনো বাঘ হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে নি।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী।
বন বিভাগের সদস্যরা সেটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা দেন। পরে গত ১২ জুলাই সুস্থ হওয়া বাঘিনীকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে বনাঞ্চলের প্রায় আট কিলো মিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
বন বিভাগ এ ঘটনাকে বাঘ সংরক্ষণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখছে।
এদিকে বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে মাত্র তিন দিনের ব্যব ধানে পূর্ব সুন্দরবনে দুই দফা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে।
প্রথমে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কে ন্দ্রের বন অফিস চত্বরে এবং পরে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নদী সাঁতরাতে দেখা যায় একটি বাঘটিকে।
দুটি ঘটনাই বনকর্মীদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভি ডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
গত ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক বন অফিসের সামনে এক টি বাঘিনী কিছুক্ষণ খোলা জায়গায় অবস্থান করে আবার জঙ্গলে ফিরে যায়।
এরপর ২৬ জুলাই সকালে কচিখালী টাইগার পয়েন্ট এলা কায় টহলরত বন বিভাগের একটি বোটের সামনে একটি বাঘকে নদী সাঁতরাতে দেখা যায়।
বোটের শব্দ শুনে বাঘটি মাঝপথ থেকে ফিরে যায়। বন বিভাগের স্মার্ট টিমের বোটচালক সাইফুর রহমান সেই বিরল দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষ ক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের নদী-খাল পেরিয়ে বাঘের চলাচল তাদের স্বাভাবিক আচ নরণের অংশ।
খাবারের সন্ধান, নিজের এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃ তিক প্রয়োজনেই তারা নিয়মিত সাঁতার কাটে। তবে এত কাছ থেকে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের কারণে বাঘ-মানুষের সং ঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সম্প্রতি সুন্দরবনে বাঘের চলাচলও আগের তুলনায় বেড়েছে।
আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপন করা ২০টি ক্যা মেরা ট্র্যাপে নতুন তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দরবনের বাঘকে নিরাপদ রাখাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষে ধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহল মুক্ত।
ফলে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে অবা ধে বিচরণ করছে এবং বন অপরাধও কমেছে।
পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর প্রধান সমন্বয়কারী ড. নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠ নগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন বাঁচলে উপ কূলও নিরাপদ থাকবে।
বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যা লয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজি জ বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, বাঘ রক্ষা করতে হলে আগে হরিণ রক্ষা করতে হবে।
হরিণই বাঘের প্রধান খাদ্য। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্ত নের প্রভাব মোকাবিলায় বাঘের আবাসস্থল রক্ষায় দীর্ঘ মেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা মানে শুধু এক টি প্রাণী সংরক্ষণ নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, তার সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশকে টি কিয়ে রাখা।
তাই বিশ্ব বাঘ দিবসে তাদের আহ্বান—চোরা শিকার ও পাচার বন্ধ, খাদ্যশৃঙ্খল সংরক্ষণ, বন ধ্বংস রোধ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই সুন্দ রবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।

About admin

Check Also

ঝিকরগাছা সরকারি এম.এল. মডেল হাইস্কুলে অনলাইনে ফলাফল প্রকাশ

আফজাল হোসেন চাঁদ, ঝিকরগাছা : যশোরের ঝিক রগাছা সরকারি এম.এল. মডেল হাইস্কুলে ২০২৬ শিক্ষা বর্ষের …