গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও তরুণদের রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
তাঁরা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও অর্জনকে রা জনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
অন্যথায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকি র মুখে পড়তে পারে।
আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আমার বাং লাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) আয়োজিত ‘বছর পেরিয়ে জুলাই সনদ: গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ অংশীজনদের সঙ্গে মতবি নিম য়’ শীর্ষক সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পা দক ড. মাহমুদুর রহমান।
এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদী উজ্জামান খোকন সভাটি সঞ্চালনা করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সা বেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তা জুল ইসলাম, দৈনিক ওয়াদা’র সম্পাদক ও অন্তর্বর্তী সর কারের প্রধান উপদে ষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পা দক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।
সভাপতির বক্তব্যে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, এই সংবিধান এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদে শের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
এবার আমাদের নতুন করে রাষ্ট্র মেরামতের সনদ তৈরি কর তে হবে।
সেই সনদে চার কোটি মানুষের স্বাক্ষর গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জনগণকেই প্রকৃত অংশীজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তিনি বলেন, অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতার জন্য ড. ইউনূস সর কারকে উপহাস করে বলা হতো এনজিওগ্রাম সরকার।
অব্যবস্থাপনা ও অযোগ্যতার জন্য বর্তমান সরকারকে অনে কে ‘লন্ডনী-গো’ সরকার বলছে।
তিনি আরও বলেন, মাহমুদুর রহমান অনেক আগেই বলে ছিলেন, ফ্যাসিবাদ রুখতে হলে গণ-অভ্যুত্থান প্রয়োজন, পাশাপাশি প্রয়োজন সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
সৈনিকদের এক যুদ্ধের পর আরেক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হয়, আমাদের সেই প্রস্তুতি নিতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ও সব সমস্যার সমাধান হয়নি, নির্বাচনেও হয়নি।
বরং সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তি উল্লসিত হচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, আ মা দের জেন-জি সফল হয়েছে। তারা ফ্যাসিবাদের আই কন কে পরাজিত করেছে। কিন্তু তাদের স্বপ্ন,রাষ্ট্র মেরামতের আকা ঙ্ক্ষা,এখনো পূরণ হয়নি।
জুলাই সনদ প্রণয়নের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিই ভুল ছিল। রাজ নৈতিক পরিপক্বতা থাকলে জুলাই সনদের আগে নির্বাচন দেওয়া হতো না।
তিনি বলেন, নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যারা এতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে,তারা কার্যত জুলাই সনদের চেতনাকেই স্বীকার করতে চায় না।
তারা বিপ্লব শব্দটি উচ্চারণ করতেও অস্বস্তি বোধ করে। অ ধ্যাপক ইউনূস সরকারের অগ্রাধিকারের জায়গায় সমস্যা ছিল। তরুণরা রাষ্ট্র সংস্কার চেয়েছিল, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা যথাযথভাবে অনুধাবন করা হয়নি।
তারপরও ওই সরকার ছিল জুলাইয়ের বন্ধু সরকার। অনভি জ্ঞতার কারণে সরকার অনেক চাপের মুখে পড়েছিল।
জুলা ইয়ের অনেক তরুনদের সংগঠন সরকারকে সহযো গি তা করার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে অসহযোগিতা করা হয়ে ছে।
বিএনপিও সরকারকে সহযোগিতা করেনি। সব মিলিয়ে সেটি ছিল একটি দুর্বল সরকার।
নির্বাচনের পর জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভা জনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর আমরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছি।
কে দেশের ভেতর থেকে, কে দেশের বাইরে থেকে মাস্টারমাই ন্ড ছিল,এখন চলছে সেই কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা।
অথচ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে জাতীয় ঐ ক্য গড়ে তুলতে হবে। বিভাজনমূলক বক্তব্যের দায় সরকা রকেই নিতে হবে।
তিনি জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এবি পার্টিসহ সব বাংলাদেশপন্থী দলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় কনভেনশন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এভাবে বিভাজন চলতে থাকলে দেশের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
আবু সাঈদ শুধু বাংলাদেশের আইকন নন, তিনি গোটা পৃথিবীর আইকন।
জুলাই বিপ্লব এক দিনের কোনো ঘটনা নয়; বিপ্লব একটি চলমান প্রক্রিয়া।
জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ ছাড়া আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতো না। আমাদের আরও একটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলে ন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের বলা হচ্ছে, তোমরা বিপ্লব করেছ, এখন রাষ্ট্র নিয়ে আর ভাবার দরকার নেই, পড়ার টেবিলে ফিরে যাও।
কোনো কোনো রাজনীতিবিদ বিপ্লবীদের ফার্মের মুরগির সঙ্গে তুলনা করছেন।
যারা তরুণদের অবদানকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন, তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেননি।
তিনি বলেন, ১৭ বছর ধরে যে জগদ্দল পাথর সরানো যায় নি, আমাদের তরুণরা সেটি সরিয়েছে।
লক্ষ্মণ সেনের মতো দুপুরের খাবার ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা পলায়ন।
যারা তরুণদের অবদান অস্বীকার করছেন, তারা অজ্ঞতা প্রসূত কাজ করছেন।
জুলাই সনদের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধান ও প্রচলিত আইনের মাপকাঠিতে জুলাই বিপ্লব হয়নি।
এটি ছিল সব আইনি সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে জনগণের অভ্যু ত্থান।
এখন ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে নানা ধরনের ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা চলছে।
আইন ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই সনদ অমান্য করা যাবে না। জুলাই সনদ আমাদের রেড লাইন।
দৈনিক ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, জুলাই এখনো হারিয়ে যায়নি।
জুলাইকে শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও জুলাইকে ছড়িয়ে দিতে হবে।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদ যেন কোনোভাবেই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোর দার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ কীভাবে তৈরি হয়, এর পেছ নে কারা রসদ জোগায়, তাদের চিহ্নিত করতে হবে।
হিটলারের উত্থানের পেছনেও নানা ধরনের শক্তি ও উপাদান কাজ করেছিল।
আমাদেরও ফ্যাসিবাদ তৈরির পেছনের শক্তিগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জুলাইয়ের চেত নাকে ধারণ করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন তারুণ্যের জুলাই ফাউ ন্ডেশনের নেতা সাগর উদ্দিন, পুসাবের সংগঠক তালহা বিন আমীন, জুলাই ঐক্যের নেতা রিয়াদুস ইসলাম জুবা, জুলাই যোদ্ধা লাবিব,স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সংগঠক সাইয়েদ আ হমেদ সরকার, শহীদ সোহেল রানার ভাই আলভী নাবিল, জুলাই রেভ্যুলেশন ওয়াচের সংগঠক সানজিদ হাসান তান ভীর, বৈষম্যবিরোধী কওমির সদস্য সচিব মাসুদুর রহমান জুনায়েদ, প্রতিবন্ধী নাগরিক পরিষদের সংগঠক ইফতেখার মাহমুদ,জুলাই সংগঠক নেছার উদ্দিন, শহীদ রাকিবের ভাই আমিন উদ্দিন, মঞ্চ ২৪-এর সংগঠক ইশরাত করিম অর্পিতা, দ্য রেড জুলাইয়ের সংগঠক রাসেল মাহমুদ এবং মুস্তাইন বি ল্লাহ হাবীবি।
এবি পার্টির সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, শাহা দাতুল্লাহ টুটুল,প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক গোলাম র ব্বানী রাজা, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, ও খুলনা সাংগ ঠনিক সম্পাদক ইয়ামিনুর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মী।

ঢাকা অফিস: 


















