শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের ভুমিকা কেমন হওয়া বাজ্ঞনীয় ?

0

|| মুহাম্মদ আব্দুল মুমীত|| প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় অনেকগুলো অঙ্গসংগঠন রয়েছে, প্রধান শিক্ষক তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রতিষ্ঠান প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ শব্দ সমষ্টির নাম।

যে কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য একজন প্রধান অত্যাবশ্যক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যেমন প্রধান শিক্ষক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মানব দেহের সাথে তুলনা করলে উহার মস্তিস্কটিই হবে প্রধান শিক্ষক। মাথা বিহীন মানব দেহের অস্তিত্ব যেমন কল্পনা করা যায় না, ঠিক তেমনি প্রধান শিক্ষক বিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বও কল্পনা করা যায় না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির ভাবনা প্রধান শিক্ষকের মস্তিস্ক হতেই নি:সৃত হয়ে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে; তাই শিক্ষালয়ের সার্বিক মানোন্নয়নের নায়ক তিনি। তাঁর যোগ্য নেতৃত্ব-ই দিতে পারে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যথানিয়মে ও সুচারুরূপে পরিচালিত হওয়ার নিশ্চয়তা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্গানোগ্রামভূক্ত শিক্ষক-কর্মচারীসহ সকল প্রকার স্টেকহোল্ডারদের মাঝে চমৎকার সুসম্পর্কের মাধ্যমে একটি সামাজিক বলয় তৈরিতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন।

তিনি একদিকে যেমন শিক্ষক, অন্যদিকে তেমনি নেতা, গাইড ও ম্যানেজার; তাই তো একজন শিক্ষকের পাশাপাশি তাঁকে যোগ্য নেতা ও সুদক্ষ ম্যানেজারের গুণাবলী থাকা আবশ্যক। প্রধান শিক্ষকের চৌকস নেতৃত্বে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন সুনির্মল ও পরিচ্ছন্নভাবে গড়ে উঠতে পারে; ঠিক একইভাবে তাঁর সামান্যতম অদূরদর্শীতার কারণে প্রতিষ্ঠানের সুন্দর কাঠামো ভেঙ্গেও পড়তে পারে দুঃখজনকভাবে।

প্রধান শিক্ষক হলেন শিক্ষকের শিক্ষক; যিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আলোকবর্তিকা হাতে সম্মুখে এগিয়ে চলেন উন্নত শিরে। মূলত তিনি শিক্ষক হলেও হৃদয়ের অলিন্দে উদ্ভাসিত হীরক ছটায় শিক্ষার্থীদের নিকট তিনি জীবন্ত একটি পুস্তক। কল্পনায় প্রধান শিক্ষক বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।

মার্জিত রুচিশীল পোশাক পরিহিত স্বশিক্ষিত উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং মহান চরিত্রের দৃঢ়তাসম্পন্ন যুক্তিবাদী, বুদ্ধিদীপ্ত, মেধাবী জ্ঞানতাপস ব্যক্তিটিই প্রধান শিক্ষক। তিনি হবেন আকাশের মতো উদার, মাটির মতো মমতা, নদীর মতো

অতিথিয়েতায় সর্বদা প্রাণবন্ত নিরপেক্ষ আচার-আচরণে ও চিন্তা-চেতনায় অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় একজন উত্তম, দক্ষ ও সুশীল ব্যক্তি। তিনি শুধু শিক্ষার্থী বা প্রতিষ্ঠানের নন; সমাজ তথা গোটা জাতির কান্ডারী তিনি। প্রধান শিক্ষক কারও কাছে প্রধান শিক্ষক, কারও কাছে হেড স্যার, কারও কাছে হেডমাস্টার, কারও কাছে আবার পÐিত মশাই। একজন হেডমাস্টার তাই জাতির অতি মূল্যবান সম্পদ, জাতি গঠনের দক্ষ ও একনিষ্ঠ কারিগর তিনি। তাঁর সম্মান ও মূল্যায়নের জায়গাও তাই সবার উপরে, যথাযোগ্য মর্যাদার আসনে।

বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিদ্যালয় কৃতি ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বাস্তবায়নে স্বপ্নের স্কুল প্রতিষ্ঠায় যে সাতটি ইন্ডিকেটর চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্ব অন্যতম। সাতটি ইন্ডিকেটর বা নির্দেশককে যথাযথ বাস্তবায়নের নিমিত্ত পঁয়তাল্লিশটি সাব-ইন্ডিকেটর বা উপ-নির্দেশক নির্ধারণ করা হয়েছে; এই উপ-নির্দেশকগুলোই নির্দেশকগুলোর যথাযথ মূল্যায়ণের যোগ্য প্যারামিটার হিসেবে কাজ করে।

নির্দেশকগুলোর গুরুত্বের প্রেক্ষিতে উপ-নির্দেশগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষকের গুরুত্বের বিচারে তাঁর নেতৃত্বের সঠিক ও যোগ্য রূপ দেখতে বারটি উপ-নির্দেশক বা বারটি প্যারামিটারে সাফল্য দেখানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একটি পরিচ্ছন্ন ও শিক্ষাবান্ধব শিক্ষালয়ের জন্য প্রয়োজন একজন দক্ষ প্রধান শিক্ষক। মেধাবী ও দক্ষতা সম্পন্ন প্রধান শিক্ষক পেতে প্রয়োজন বারটি উপ-ইন্ডিকেটরের যথাযথ অনুশীলন। একজন প্রধান শিক্ষককে সর্বদা মনে রাখতে হবে তিনি শাসক নন, সেবক; মনোভাবের এই তেজদীপ্ত অথচ বিনয়ী প্রকাশ ভঙ্গি একটি সুন্দর প্রশাসনিক কাঠামো তৈরিতে অত্যাবশ্যক।

তাঁকে ভুলে গেলে চলবে না ”তিনি একজন শিক্ষক”, কার্যত অতিরিক্ত হিসেবে তিনি প্রধান শিক্ষক বা হেডমাস্টার।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রোল মডেল বা স্বপ্নদ্রোষ্টা হলেন প্রধান শিক্ষক। তাঁর ইচ্ছাতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নামক গাছে কুঁড়ি আসে, যা সময়ের ¯্রােতে কোন এক কালে পাতা পল্লবে মুখরিত হয়ে সুশিক্ষার সুবাতাস ছড়ায়। এর ব্যত্যয় ঘটলে কাগজে কলমে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় বটে, কিন্তু বাস্তবে তা আলো ছড়াতে পারে না। একজন প্রধান শিক্ষকের যেমন সম্মান রয়েছে তেমনি রয়েছে দায়িত্ব ও কর্তব্যের সুবিশাল ব্যাপ্তী।

তাঁর কাজের শুরু আছে কিন্তু শেষ কূল ঠাহর করা নিতান্তই দুষ্কর। বিদ্যালয়ের এমন কোন কাজ নেই যেখানে তাঁর হাতের ছোঁয়া লাগেনা; অর্থাৎ প্রতিটি কাজে ও পরিকল্পনাতেই যেন প্রধান শিক্ষককে চাই-ই, চাই। বিদ্যালয়ের কৌশলগত পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন, মাসিক ভিত্তিক শিক্ষকের ডায়েরী পরিবীক্ষণ, শ্রেণিপাঠদান পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান, শিখন-শিখানো বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে পূর্ণ শিক্ষক সভার আয়োজন, বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক সভার আয়োজন, শিক্ষকদের চাকুরিকালীন প্রশিক্ষণ, প্রতি কর্মদিবসে প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির তথ্য সংরক্ষণ, সহ-শিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ এবং শিক্ষক অভিভাবক সমিতির (পিটিএ) কার্যক্রম বেগমান করা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর বিচক্ষণ ও কার্যকরী উপস্থিতি প্রয়োজন।

তাছাড়া যেকোন উন্নয়ন মূলক কার্যক্রম ও সংস্থাপনের কাজসহ ম্যানেজিং কমিটির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার ক্ষেত্রেও চাই প্রধান শিক্ষকের সুণিপুন সক্ষমতা।
এইরূপ বৃহৎ ও জটিল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের জন্য প্রধান শিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিক গুণের পাশাপাশি বিশেষ কিছু গুণের সন্নিবেশ থাকা চাই। একজন সার্থক নেতা ও যোগ্য ম্যানেজার হওয়ার জন্য যেমন বেশ কিছু দক্ষতা আয়ত্ব করা চাই; সুদক্ষ প্রধান শিক্ষক হওয়ার জন্যও সে দক্ষতার অনুশীলন একান্ত প্রয়োজন।

বিশেষ করে অন্ত:ব্যক্তিক ও আন্ত:ব্যক্তিক দক্ষতা, চাপ মোকাবিলার দক্ষতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা, অনুধাবন দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতার মতো যোগ্যতাগুলো ভাল প্রশাসকের জন্য অবশ্যয় আয়ত্ব করা বাঞ্চনীয়। তাছাড়া ভালো প্রধান শিক্ষক হওয়ার জন্য একদিকে সহমর্মিতা বা হৃদয়বান হওয়া যেমন প্রয়োজন, ঠিক একইভাবে নীতির ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক থাকা চাই পর্বতসম অটল ।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আজকাল প্রধান শিক্ষক বলতে শুভ্র পোশাক পরিহিত রাশভারি, মেজাজি অথচ ¯েœহপ্রবণ, দায়িত্ববান মানুষটিকে যেন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রধান শিক্ষককের যে তেজদীপ্ত দৃঢ়তা তা যেন আজ বিলীন হতে চলেছে। প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব যাদুকরী যে ব্যক্তিসত্বা তা যেন আজ মিইয়ে গেছে। আকর্ষিক প্রতিষ্ঠানে গেলে পরিচয় না পেলে ঠাহর করা মুশকিল হয়ে পড়ে হেডমাস্টার বাবুুকে সন্ধান করা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও আজকাল প্রধান শিক্ষককে আলাদা চোখে দেখে না। প্রতিষ্ঠান প্রধানের অবস্থান নাজুক হওয়ায় শিক্ষালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও নড়বড়ে হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। প্রধান শিক্ষকও সাম্প্রতিক শ্রেণি পাঠদান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উন্নয়ন অপেক্ষা ম্যানেজিং কমিটিসহ অন্যদিকেই যেন বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন, যা কখনো কাম্য হতে পারে না।

প্রধান শিক্ষক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ, তাই যেকোন মূল্যে তাঁকে প্রতিষ্ঠান বান্ধব করার কোন বিকল্প থাকতে পারে না। আমরা অতি সহজেই বলে থাকি শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়মুখী নয়; কেন নয় এর বহুবিধ কারণ থাকতেই পারে, তা নিখৃুঁতভাবে অনুধাবন করে, একটা একটা করে সমাধানের দিকে এগুতে হবে। উপর থেকে শেকড়ের দিকে গেলে কারও পক্ষেই হয়ত এ দায় এড়ানো সম্ভব হবে না। তাই শিক্ষাঙ্গনের স্বার্থে, শিক্ষার স্বার্থে, সর্বোপরি দেশের জাতীয় স্বার্থে প্রধান শিক্ষক তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গতিশীল করতে সকল পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের ঐকান্তিক সহযোগীতার প্রয়োজন; শুরুটা হওয়া চাই প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকেই। আমাদের প্রতিষ্ঠানে আমরা দেখতে চাই নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বিখ্যাত ”হেডমাস্টার” গল্পের কৃঞ্চপ্রসন্ন বাবুকে।
লেখক: মুহাম্মদ আব্দুল মুমীত(শিক্ষাগভেষক )

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here